নিজস্ব প্রতিবেদক
১ নভেম্বর ২০২৬, ৮:০০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৭১ জন

খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয় যেন ভূতের বাড়ি, শহরে বসেই কার্যক্রম চালান রেঞ্জার

Copy Link

 

বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয় যেন এক ভূতের বাড়ি। দিনের পর দিন তালাবদ্ধ পড়ে থাকছে কার্যালয়ের প্রধান ফটকসহ প্রতিটি কক্ষ। দায়িত্বপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান ও অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নিয়মিত দেখা মেলে না কর্মস্থলে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম রেঞ্জ এলাকায় অবস্থান না করে জেলা শহরে বসেই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন রেঞ্জ কর্মকর্তা।

অন্যদিকে, এই রেঞ্জের আওতাধীন বনাঞ্চলে জোত পারমিট অনুমোদন ও কাঠ পাচারকে কেন্দ্র করে উঠেছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি কাগজপত্রের আড়ালে ভুয়া হোল্ডিং তৈরি, একই হোল্ডিং একাধিকবার ব্যবহার এবং অবৈধভাবে গাছ কাটার সুযোগ করে দিয়ে একটি চক্র ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য

বান্দরবান বন বিভাগের একটি বিশেষ সূত্র জানায়, সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামান। সূত্রটির দাবি, বান্দরবান সদর রেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেতে তিনি একাধিকবার তদবির ও দেনদরবার করেন। তবে প্রত্যাশিত পদায়ন না পেয়ে পরবর্তীতে রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম খেয়াচল্যং রেঞ্জের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সরেজমিনে খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক থেকে শুরু করে কার্যালয়ের প্রতিটি কক্ষ তালাবদ্ধ। সেখানে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান কিংবা অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেঞ্জ কর্মকর্তা ও তাঁর অধীনস্থ কর্মচারীরা নিয়মিত এলাকায় অবস্থান করেন না। এমনকি রেঞ্জ কার্যালয়ের আশপাশেও তাঁদের স্থায়ী বা ভাড়াটিয়া বাসস্থানের ব্যবস্থা নেই বলে দাবি স্থানীয়দের। এ অবস্থায় সরকারি দায়িত্ব পালনে এমন অনুপস্থিতি ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

 

এদিকে অনুসন্ধানে খেয়াচল্যং রেঞ্জের আওতাধীন ৩১৭ নম্বর ক্যাচলং মৌজা ও ৩৪৯ নম্বর ঘেরাউ মৌজায় জোত পারমিট অনুমোদন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মৌজায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতের হোল্ডিং সংখ্যা সীমিত এবং অতীতেও একাধিকবার জোত পারমিটের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। অথচ রাশেদুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ২০টি জোত পারমিট অনুমোদন করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সরেজমিনে গাছ যাচাই ও পরিমাপ না করেই সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশে ভুয়া ‘এ-ফরম’ তৈরি করা হচ্ছে। একই মৌজা ও একই হোল্ডিং একাধিকবার ব্যবহার করে কৃত্রিম হোল্ডিং তৈরির মাধ্যমে জোত পারমিটের বৈধতা দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কাগজপত্রের ভিত্তিতে জেলা শহরে বসেই রাতের আঁধারে বনের মূল্যবান গাছের অবৈধ খাঁড়া মার্কা ও পাশ মার্কা দেওয়া হচ্ছে। এর বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট একটি চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া জোত পারমিটের আড়ালে চম্পাফুল, গুটগুটিয়া, বৈলাম, গর্জন ও শিউরীর মতো মূল্যবান ও পুরোনো গাছ কাটা হচ্ছে। নির্বিচারে এসব গাছ নিধনের ফলে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক ছায়াবিন্যাস বা ক্যানোপি নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি এশীয় হাতি, মায়াহরিণ ও বিরল প্রজাতির উল্লুকসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবে বন উজাড় অব্যাহত থাকলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি পাহাড়ি পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বনভূমি ধ্বংসের ফলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ঝিরি ও পাহাড়ি ছড়ার পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পানিসংকট তীব্র হতে পারে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সরকারি বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে এলাকার সহজ-সরল ও দরিদ্র আদিবাসীদের নাম ব্যবহার করে কৃত্রিম কাগজপত্র তৈরি করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত জোত মালিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বাঙালি কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ কাটার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি বর্তমানে জেলার বাইরে অবস্থান করছেন। জেলা সফরে আসলে পরে যোগাযোগ করবেন।

খেয়াচল্যং রেঞ্জের এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বান্দরবানের মোশারফের জাতীয় অ্যাথলেটিকসে একের পর এক সাফল্য

১

বান্দরবানে প্রচার-প্রচারণার অভাবে ক্রেতাশূন্য যুব মেলা

২

সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের প্রধান সমন্বয়কারী থোয়াইচিং মং শাককে শোকজ

৩

খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয় যেন ভূতের বাড়ি, শহরে বসেই কার্যক্রম চালান রেঞ্জার

৪

বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধার ঘটনায় ২৮ নাগরিকের নিন্দা

৫

রোয়াংছড়ির আন্তা পাড়া আনন্দ বৌদ্ধ বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসব অনুষ্ঠিত

৬

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের হিসাব-সহকারীর কমিশন বাণিজ্য

৭

পার্বত্য চট্টগ্রামে নারী মুক্তির আন্দোলন বিস্তৃত করার আহ্বান

৮

কাঞ্চন মালা তঞ্চঙ্গ্যার প্রয়াণে কে এস মং এর গভীর শোক প্রকাশ

৯

কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে এইচএসসিতে শতভাগ পাস, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৭ জন

১০

সাংবাদিক ও সমাজকর্মী উজ্জল তঞ্চঙ্গ্যার মায়ের পরলোকগমন

১১

রাঙ্গামাটির স্বর্ণটিলায় প্রথমবারের মতো চালু হলো ‘পবিত্র সিরাতুল মুস্তাকিম’

১২

আলীকদমে ১৪ বছরের কিশোরীর মৃত্যু ঘিরে রহস্য

১৩

রাঙামাটিতে এই প্রথমবার উদয়ন ক্লাবের ইউএফএল সিজন ওয়ানে নিলামে দল গঠন

১৪

বান্দরবানে ২২ কোটি টাকার ইয়াবা ধ্বংস করল বিজিবি

১৫

রাঙামাটিতে ক্ষতিপূরণ পেতে জাল উত্তরাধিকার সনদ প্রদর্শন, আটক-১

১৬

পাহাড় কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর অসহায় পরিবারটির পাশে পিসিসিপি সভাপতি আসিফ ইকবাল

১৭

বান্দরবানের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে পার্বত্য মন্ত্রীর মতবিনিময়

১৮

নাইক্ষ্যংছড়িতে ডিজিটাল ইউনিয়ন পরিষদ সিস্টেম চালু

১৯

সেনেগালে যুব অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে বান্দরবানের নয়ন ত্রিপুরা

২০
error: Content is protected !!