ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে জনসংহতি সমিতি, বদলে গেল পাহাড়ি অঞ্চলের নির্বাচনী সমীকরণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান–৩০০ সংসদীয় আসনের নির্বাচনী সমীকরণে বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়ের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বান্দরবান–৩০০ আসনে লড়াই হবে জটিল—এমন গুঞ্জন ছিল। মাঠপর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছিল, এই আসনে বিএনপি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
শুরু থেকেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন সাচিং প্রু জেরী। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। আর জনসংহতি সমিতির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং। তিনজনই নিজ নিজ অবস্থান থেকে জেলার বিভিন্ন দুর্গম উপজেলায় গণসংযোগ ও মতবিনিময় করে নির্বাচনী মাঠ সরগরম করে তুলেছিলেন।
এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রাথমিকভাবে মং সা প্রু চৌধুরীকে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে তাকে পরিবর্তন করে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা সুজা উদ্দিন সুজা-কে মনোনয়ন দেয়া হয়। অন্যদিকে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে রিপন চক্রবর্তীকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি মনোনয়ন জমা দেননি বলে জানাযায়।
এমন অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একটি সিদ্ধান্ত নির্বাচনী চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। দলটির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাঙামাটি আসনে দলটির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার এবং বান্দরবান আসনে কেন্দ্রীয় সদস্য কে এস মং-এর মনোনয়নের সম্ভাবনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে দলটি। কিন্তু দলটি অন্য কোনো দল-কে নির্বাচনে সমর্থন দিবে কিনা এই বিষয়ে এখনো জানা যায়নি। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা দলটি বিএনপি-কে সমর্থন জানিয়ে সরে এসেছে নির্বাচন থেকে। আরো জানাযায় এই দুইটি আসনে তারা মনোনয়ন ও সংগ্রহ করেননি।
জনসংহতি সমিতির একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে সামনে রেখেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক দুর্বলতা বা পশ্চাদপসরণ নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত ও দূরদর্শী রাজনৈতিক অবস্থান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভোট একটি বড় ফ্যাক্টর। জনসংহতি সমিতি নির্বাচনে না আসায় এই ভোটের একটি বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির প্রার্থী সাচিং প্রু জেরীর সঙ্গে জনসংহতি সমিতির সম্ভাব্য প্রার্থী কে এস মং-এর ভৌগোলিক ও সামাজিক ভিত্তি এক হওয়ায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এই দুই দলের মধ্যেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন,“জনসংহতি সমিতি নির্বাচনে থাকলে বান্দরবানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো। দলটি নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এটি বিএনপির জন্য স্পষ্টভাবে একটি সবুজ সংকেত। এখন ধানের শীষের প্রার্থী সাচিং প্রু জেরীর জয় নিশ্চিত বলেই আমরা আশাবাদী।”
তবে বিএনপির ভেতরে মনোনয়ন ইস্যুতে কিছুটা অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে বলেও জানা গেছে। একাংশ মনোনয়নের বিরোধিতা করে মিছিল-সমাবেশ করলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোটারদের অনেকেই মনে করছেন, জনসংহতি সমিতি নির্বাচনে অংশ না নিলে বান্দরবানের ভোটের বড় অংশ বিএনপি মুখী হবে। সে ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত ৩০০ নং আসনে বিএনপির জয়ের সম্ভাবনাই বেশি।
উল্লেখ্য,“বান্দরবান–৩০০ আসনে ইতি মধ্যে পাঁচটি দলের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এখানে বাংলদেশে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন জেলা বিএনপির আহ্ববায়ক সাবেক এমপি রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক আবু সাইদ মোঃ সুজাউদ্দিন সুজা। জামায়াত ইসলামী থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বান্দরবান জেলার নায়েবে আমীর এ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আবুল কালাম। ইসলামী আন্দোলন থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বান্দরবান জেলার সভাপতি আবুল কালাম আজাদ। জাতীয় পার্টি (কাদের) থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ। ইতিমধ্যে মনোয়ন বাঁচায় শেষে সকল প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ করার সম্ভবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
আরো পড়ুন→বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ২টি বন্দুক ও কার্তুজ উদ্ধার করেছে পুলিশ


