বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মচারীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন বান্দরবান জেলা প্রশাসন–এর কাছে।
জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গত ১০ ফেব্রুয়ারি দুই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ডিসি আরও জানান, বিদ্যালয়ের কয়েকজন অস্থায়ী কর্মচারীও অভিযোগ করেছেন—চাকরি স্থায়ী করার প্রলোভন দেখিয়ে প্রধান শিক্ষক তাদের যৌনভাবে নিপীড়ন করেছেন। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১০ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) ফয়জুর রহমান–এর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তদন্ত কমিটির প্রধান ফয়জুর রহমান জানান, এ পর্যন্ত সাতজন শিক্ষার্থী, একজন অভিভাবক এবং বিদ্যালয়ের সাত থেকে আটজন শিক্ষকসহ মোট বেশ কয়েকজনের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে। “তাদের সবাই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সমর্থন করেছেন,” বলেন তিনি। তিনি আরও জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এগুলোকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন। আগামী সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
এর আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক এই প্রতিবেদককে ফোনে বলেন, “আমি ব্যস্ত আছি, পরে কথা বলব।” তবে এরপর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহ মোহাম্মদ রেজাউল করিম ১৬ ফেব্রুয়ারি জানান, ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন এবং যাওয়ার আগে তিনি কাউকে দায়িত্বও অর্পণ করেননি। তিনি বলেন, কিছু শিক্ষার্থী জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেছে বলে শুনেছেন, তবে বিস্তারিত জানেন না।
জানা গেছে, ১০ ফেব্রুয়ারি চার থেকে পাঁচজন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে একটি স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থার দ্বারস্থ হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। মানবাধিকার কর্মী ডাও নই প্রু নেলি জানান, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে নিয়ে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
এই প্রতিবেদনে কথা বলা একাধিক অভিযোগকারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রধান শিক্ষক তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের শিকার বানিয়েছেন।
অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ করে বলেন, তাকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ভয়ে ও লজ্জায় বিষয়টি প্রথমে গোপন রাখলেও পরে তিনি তার দাদী ও এক মানবাধিকার কর্মীকে জানান এবং জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকতে পারে।
একজন অভিভাবক জানান, তার ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে ফেল করার পর পুনরায় ভর্তি হলে প্রধান শিক্ষক তাকে ব্যক্তিগতভাবে “গাইড” করার প্রস্তাব দেন এবং সন্ধ্যায় তার কাছে যেতে বলেন। কয়েক মাস পর ছেলে প্রধান শিক্ষকের কাছে যেতে অস্বীকৃতি জানায় এবং ভীতসন্ত্রস্ত আচরণ করতে থাকে। পরে সে কথিত নির্যাতনের কথা পরিবারের কাছে প্রকাশ করে।
একজন অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটর অভিযোগ করেন, অফিস সময়ের পর তাকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক অশোভন আচরণ করা হয়। তিনি প্রতিবাদ করলে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন।
এদিকে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম হোসাইনি জানান, তার দপ্তরে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পৌঁছায়নি। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক কোনো ছুটির আবেদনও করেননি।
আরো পড়ুন→প্রধানমন্ত্রীর নিকট খোলা চিঠি


