আরাফাত খাঁন
১৮ মে ২০২৬, ৮:৫৪ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১৭১ জন

এহসান মাহমুদ –এর ”আদিবাসী প্রেমিকার মুখ” কব্যগ্রন্তের প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

আজ ১৮ মে ২০২৬ সোমবার, কবি, কথা সাহিত্যিক, সাংবাদিক এহসান মাহমুদ এর ”আদিবাসী প্রেমিকার মুখ” কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। মোস্তফা মুশফিক এর সঞ্চালনায় বইটির দ্বিবাষিক প্রকাশনা অনুষ্ঠান আয়োজন করে ঐত্য প্রকাশনা। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, ঐতিহ্য প্রকাশনার প্রধান নিবার্হী আরিফুর রহমান নাঈম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুষÍক বোর্ড এর বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও শিক্ষক কুদরত—ই হুদা ও কাব্যগ্রন্থের লেখক এহসান মাহমুদ।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অধিকার কমীর্ মেইনথিন প্রমিলা বলেন, বইটি প্রথম হাতে পেলাম তখন দেখলাম প্রেমিকা কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রেমিকা গোটা পাহাড়ের একজন প্রতিনিধি্ সেখানে গোটা পাহাড়ের ভূমি সমস্যার কথা বলা আছে, নানা সংকটের কথা বলা আছে। নিরাপত্তা ও বঞ্চনার কথা বলা আছে। এক সময়কার রাঙ্গামাটির কথা বলেছেন কবি। আমরা যারা আদিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করি আর কত শান্তির বয়ান দিলে আর কত আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকারের কথা বললে আদিবাসী জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হবে। নিশ্চয় আগামীতে রাষ্ট্যীয় নীতিনিধার্রকরা সে বিষয়ে ভাববেন।

লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, এখানে কবি আসলে কী অর্থে পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেখেছেন সেটা গুরুত্ব্পূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে না দেখলে তাঁর বোঝা হতোনা একই ভূখন্ডের এবং দেশের নাগরিক হলেও তাঁদের জীবনের সংগ্রাম একদমই আলাদা। তার কবিতা আদিবাসী কবিতা। কেননা, কাপ্তাই হৃদের দিকে তাকালে সেখানে আদিবাসীদের ভূমি হারানোর যন্ত্রণা, দেশান্তরের দু:খ দেখতে পান। কার আয়নায় তিনি পাহাড় দেখবো। কবি পাহাড় দেখতে চান যে হেজিমনি জারি আছে তার চশমায় নাকি যে অঞ্চলের মানুষের জীবন বোধ দিয়ে তিনি দেখতে চান। বইয়ের একটি জায়গা জুড়ে একটি জলপায় রঙ আছে। এখানে একটি কল্পনা চাকমার একটি প্রশ্নও আছে। জুলাই অভ্যুত্থানে যতগুলো গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে তার মধ্যে কল্পনা চাকমাকে নিয়ে লেখা গ্রাফিতি ছিল জনপ্রিয়। মূলত এই বইয়ে কবি আদিবাসী প্রেমিকার মুখ দিয়ে আদিবাসী জীবনের বঞ্চনার কথাগুলো আমাদের দৃষ্টিতে নিয়ে এসেছেন।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুষক বোর্ড এর বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও শিক্ষক কুদরত—ই হুদা বলেন, এই বইতে যা আছে কবি বলতে চাচ্ছেন তার প্রেমিকা হচ্ছেন একজন আদিবাসী মেয়ে। এই বইতে যতনা প্রেম আছে তার চেয়ে আছে আদিবাসী জীবনের বিপন্নতা আর বেদনা। তার ষবাদগুলো দেখেন— জলপাই সেপাই, জলপায় ছাইনি, ঠান্ডা কালো নল, লারমার খুন, বর্গি, সেটলার,। যতটা না প্রেম আছে, পাহাড়ের সৈন্দর্য্য আছে তার চাইতে বেশি আছে প্রেমিকার অসহায়ত্ব আর বেদনা। এখানে আদিবাসী প্রেমিকা মানে কবি আসলে পুরো আদিবাসী জনগোষ্ঠীকেই বুজিয়েছেন। আমার মনে হয়েছে কবি এখানে আরো প্রেম আর প্রকৃতি নিয়ে মনযোগ দিতে পারতেন। কিন্তু আমি ভাবলাম এখানে কবি যতটানা বরিাগত হিসেবে চিন্তা করেছেন তার চেয়ে অনেকটা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভেতরের একজন হিসেবে ভাববার চেষ্টা করেছেন। তবে পুরো আদিবাসীদের একজন হিসেবে ভাবতে পেরেছেন সেটা আমি দাবী করবো না।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, এই বইটি একটি বিশেষ একটি এলাকা, বিশেষ একটি জনগোষ্ঠী এবং জীবন সংগ্রামের সাথে যুক্ত। কাজেই এ বইটিকে প্রেমের কবিতা হিসেবে পড়তে চাইলে সে এলাকার ও জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে গাঁয়ে মেখেই এই বইটি পড়তে কবে। এখানে প্রতিনিধিত্বকরণের সংকটতো আছেই। তার চাইতে আরো অনেক বেশি সংকটের কথা বলা আছে। তবে এখানে একটা অসাধারণ সংলাপ রয়েছে। এখানে রাষ্ট্র যেভাবে কাজ করেন তার বাইরেও অন্যান্যভাবেও দেখার লেন্স আছে । তীব্র ব্যঙ্গাত্ব আছে। এগুলো রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে।

এহসান মাহমুদ বলেন, আমি যখন চট্টগ্রামে বাংলাদেশ টেলিভিশন এর সাথে যুক্ত ছিলাম তখন বইটি সাজানোর চেষ্টা করি। চট্টগ্রামে যখন ছুটির দিন তখন আমি ভাবতাম— কী করবো। তখনই লেখা শুরু করি। আপনারা জানেন যে, বাংলাদেশ একটি জাতিগত, ভাষাগত ও ধমীর্য় বৈচিত্র্যের দেশ। যখন সংবিধান রচনা করা হয় তখন সেখানে শুধুমাত্র বাঙালির সংবিধান করে পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে বাদ দেয়া হল। তারপরই একটা রাজনৈতিক লড়াই হয়ে গেল পাহাড়ে। তারপর সেখানে একটি চুক্তি হয়ে গেল যা পার্বত্য চুক্তি নামে পরিচিত। কিন্তু পপুলার মিডিয়ায় আসলো মান্তি চুক্তি হিসেবে। মূলত এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শান্তিতে নোবেল পাওয়ার একটা চেষ্টা ছিল। কিন্তু পাহাড়ে উন্নয়নের নামে যতগুলো জিনিস হয়ে গেল সেদিকে মনযোগ নেই। বলা হয়েছে সেখানে ইকো—ট্যুরিজম হবে। কী একটা বেপার ইকো ও থাকবে আর ট্যুরিজমও থাকবে। এই বিষয়টা আমার কাছে একটু কেমন যেন লেগেছে। এগুলো নিয়ে আমি চেষ্টা করেছি এ বৈপ্যরীত্যগুলো নিয়ে আসার জন্য।

তিনি আরো বলেন, আমরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলো। পরে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটা স্বৈরাচারকে বিদায় করলাম। এরপর ২০২৪ সালে গণভ্যুত্তানের মধ্য দিয়ে আরেকটি স্বৈরাচারকে বিদায় করলাম। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কী শুধুমাত্র এভাবে গনঅভ্যুত্থান করে যাবে? আমরা আর সে ধরণের স্বৈরাচারের বাংলাদেশ চাইনা। ১৯৭১ সালে যে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধার হাত ধরে যুদ্ধ করেছেন, ২০২৪ সালে যে চাকমা, গারো তরুণ আমার হাত ধরে মিছিল করেছেন সে যে বাংলাদেশ চাই যে ন্যায্যতার জায়গটি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই আমার এ বইটি সামনে নিয়ে আসা।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, আমি যখন এই আয়োজনে আমন্ত্রণ পেলাম তখন গত কয়েক দিন আগে থেকে আমি কয়েকটা ফোন পেলাম। অনেকেই বলেছেন— এখানে আমি আসলে আমার সরকারের পলিসির বাইরে যাবে। আগে আমি দেখতাম পত্র—পত্রিকায় লেখা হয়— ক্ষুদ্র—নৃগোষ্ঠী। বিষয়টি আমার কেমন কেমন লাগতো। কিন্তু তারাতো ক্ষুদ্র নয়। ক্ষুদ্র—নৃগোষ্ঠী বলেন আর আদিবাসী বলেন আসলে সে জনগোষ্ঠী তো একই। তাদের সংগ্রাম ও জীবনবোধ আমাদেরকে বুঝতে হবে। আসলে মানব সভ্যতার ইতিহাস যদি আমরা দেখি তাহলে আমরা দেখি আমরা পরষ্পর পরষ্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। কেন লড়াই করছি? কারণ আমরা সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সে সমতা প্রতিষ্ঠায় আমাদের মূল লক্ষ্য।

তিনি আরো বলেন, আমাদের মধ্যে বিভাজনের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি—গোষ্ঠী, নারী—পুরুষ। নানা ধরণের বিভক্তির মাঝে আমাদের যদি একটা রাষ্ট্রীয় দর্শন ঠিক করতে পারি যে, কোনো বিভক্তিকে আমরা মেনে নিবো না। আমাদের দেশে মেজোরিটি হলো— বাঙালি। এই বাঙালি বাদেও আরো অনেকগুলো জাতিগোষ্ঠী আছে। একসময় বলা হলো— এত ঝামেলা না করে বাঙালি হয়ে যাও, ল্যাটা চুকে যাক। কিন্তু কোনো জাতিগোষ্ঠী যতই ক্ষুদ্র করুক না কেন, আমাদের কাছে দুটি পন্থা আছে। একটি হলো আমাদের সাথে মিশে যাও, আরেকটা হলো যে জনগোষ্ঠীকে সহযোগীতা করে তারা যেন তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও জীবনবোধ নিয়ে টিকে থাকতে পারে। যদি আমরা কল্যাণমুখী, উদার ও গণতান্ত্রিক হন তাহলে আপনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিবেন। তার মধ্যেও আমরা যদি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই তাহলে রাষ্টেৃর চোখে কে নৃগোষ্ঠী, কে বৃহৎ, কে ক্ষুদ্র সে বিষয়ে আমাদেও বিভাজন থাকা উচিত হবে না। আমরা চাইবো বাংলাদেশের সকল নাগরিক সমানভাবে বিবেচিত হবে। আমাদের সরকার এ ধরণের মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি। আমরা সকলেই বাংলাদেশী। পাহাড়ের মানুষের প্রতি অকাট্য ভালোবাসা আছে। তাঁদেরকে সংগে নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে আছে। পাহাড়ের সংস্কৃতি খুবই বণার্ট্য। পাহাড় ও সমতলের মানুষের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে যদি আমরা একটা সৈহার্দ্যপূর্ণ সংস্কৃতি বিনিমার্ণ করতে পারি তাহলে বিশ্বে আমরা ভালো সভ্যতা বিনিমার্ণ করতে পারবো।

রো পড়ুন→ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যের প্রতিবাদে পিসিসিপির ক্ষোভ ও নিন্দা

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টিকে থাকার নামই বিশ্বাস

দেশব্যাপী মাজারে হামলার ঘটনার পরিতবাদে রাঙামাটিতে মানবন্ধন

নাইক্ষ্যংছড়িতে চোরাচালান দমনে সম্মিলিত উদ্যোগের তাগিদ’ নবাগত ইউএনও’র

কে এস মং-এর উদ্যোগে চট্টগ্রামে চিকিৎসা পেয়ে চোখ ভালো হলো ৭ রোগীর

এহসান মাহমুদ –এর ”আদিবাসী প্রেমিকার মুখ” কব্যগ্রন্তের প্রকাশনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যের প্রতিবাদে পিসিসিপির ক্ষোভ ও নিন্দা

প্রয়াত শন সূচী চাকমার সাপ্তাহিক ক্রিয়া অনুষ্ঠানে আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য কে এস মং

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতৃত্বে আলোচনার কেন্দ্রে সজল-জ্যাকি

বাঘমারা বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি কে এস মং-এর গভীর সমবেদনা

হাটহাজারীতে দৈনিক সাঙ্গুর সাংবাদিক জাহাঙ্গীরের ওপর হামলা

১০

বান্দরবানে ভোররাতে আগুনে পুড়ে ছাই দোকান ও বসতঘর

১১

আরণ্যক এর আত্মকথা

১২

লোগো উন্মোচনের মধ্য দিয়ে শুরু ব্লাইন্ড ক্রিকেট এশিয়া কাপের কাউন্টডাউন

১৩

অনলাইন বাস টার্মিনাল ও সিএনজি চালকদের ডাটাবেস উদ্বোধন করেন পার্বত্য মন্ত্রী

১৪

রাঙ্গামাটিতে চাকমা কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় ঢাকায় পিসিপির বিক্ষোভ

১৫

জীবনের জটিল আবর্ত

১৬

আবারও কমলো সোনার দাম: ভরিপ্রতি কমলো ২২১৫ টাকা

১৭

৫৭ হাজার ছাড়াল বাংলাদেশি হজযাত্রীর সংখ্যা, ফিরতি ফ্লাইট শুরু ৩০ মে

১৮

আলীকদমে নববধূর রহস্যজনক মৃত্যু, কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা

১৯

যে কোনো সময় কমিটির ঘোষণা, ঢাকা উত্তর যুবদলের কমিটিতে আলোচনার শীর্ষে যারা!

২০
error: Content is protected !!