সুফল চাকমাঃ বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ের উঁচুনিচু সর্পিল সড়কের দুইধারে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল-হলুদ পাকা কাজুবাদামের ফল। একসময় পাহাড়ের বাগানে পড়ে থেকে পচে যেত এই ফল। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই কাজুবাদাম এখন পাহাড়ের মানুষের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে কাজুবাদামকে ক্যচনাট বা থাম নামে বলা হয়। বাংলায় এটি কাজুবাদাম এবং ইংরেজিতে Cashew Nut. এর বৈজ্ঞানিক নাম Anacardium occidentale. আগে পাহাড়ের অধিকাংশ মানুষ জীবিকার জন্য সম্পূর্ণ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু জুমচাষে আগের মতো ফলন না হওয়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাদযোগ্য জমি সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এখন স্থায়ী ফলদ বাগান তৈরীতে ঝুঁকছেন পাহাড়িরা। বিশেষ করে কাজুবাদাম চাষ করে অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের শুরুতে পাহাড়ি এলাকায় গেলে দেখা যায়, কেউ কাজুবাদাম ছিড়ছেন,কেউ কুড়াচ্ছেন, আবার কেউ শুকাচ্ছেন।
বর্তমানে পাহাড়জুড়ে কাজুবাদাম চাষিদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে প্রতিমণ কাজুবাদাম সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে পাহাড়ে এখন অনেক পরিবারের ছোট-বড় কাজুবাগান রয়েছে। কারও কয়েকশ, আবার কারও ২০-৩০একর জুড়ে হাজার হাজার গাছ।
অতিসম্প্রতি রুমা ও থানচি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে,রাস্তার ধারে ও বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা কাজু বাদামের ফল।
থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নের ৫নম্বর ওয়ার্ডের দিনতে পাড়ার কারবারি ও কাজুবাদাম চাষী রেইনিং ম্রো(৬৩) জানান, তার পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে আগে জুমচাষ করতেন। কিন্তু জুমে আগের মতো ফলন না হওয়ায় এখন স্থায়ীভাবে কাজুবাদাম চাষ করছেন। তিনি বলেন, আমার ২৫একর জমিজুড়ে প্রায় ২হাজার কাজুবাদাম গাছ আছে। গতবছর ফলন তেমন ভালো হয়নি তারপরও ২৭মণ কাজু বাদাম বিক্রি করে ১লাখ ৪৮হাজার ৫০০টাকা পেয়েছি। এবছর ভালো ফলন হয়েছে তাই গতবছরের দ্বিগুন -৫৪মণ ফলনের আশা করছি, এতে প্রায় ২লাখ ৯৭হাজার টাকা আয় হতে পারে বলে জানান তিনি।
একই ইউনিয়নের থাংনাং পাড়ার লংছাই খুমী(৪৫)বলেন, তার ১৫ একর জুড়ে কাজুবাদাম বাগান আছে গত বছর ৫০মণ কাজুবাদাম প্রতিমণ ৬হাজার ৬শতটাকা করে বিক্রি করে ৩লাখ ৩০হাজার টাকা পেয়েছিলেন। চলতি বছরও সেরকম আশা করছেন বলে জানান তিনি।
থানচি উপজেলার কমলা বাগান পাড়ার বাজেরুং ত্রিপুরা (৫০) জানান, তিন বছর আগে বিভিন্ন ফলদ বাগানের পাশাপাশি কাজুবাদাম চাষ শুরু করেছেন। গতবছর ৩০০গাছ থেকে ২০মণ কাজুবাদাম বিক্রি করে ১লাখ ১২হাজার টাকা আয় করেন। এবছর ৪০মণ ফলনের আশা করছেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন আগে সম্পূর্ণ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন জুমে ফলন কম হওয়ায় বিভিন্ন ফলদ বাগান ও কাজুবাদাম চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।
বান্দরবান উপশহর বালাঘাটায় অবস্থিত কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্টান কিষাণঘর এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেকুল ইসলাম জানান,গতবছর তারা মণপ্রতি কাজুবাদাম সাড়ে সাত হাজার থেকে আটহাজার টাকা দরে ক্রয় করেছিলেন। চলতিবছর এখনও ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়নি, তবে শিগগিরই শুরু হবে। তিনি বলেন ২০২০সাল থেকে কিষাণঘর চালু করেছেন। এখানে ৭৪জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্টানিকভাবে কৃষিঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিষ্টান হিসেবে যেমন ঋণ পাচ্ছেন না,তেমনি তাদের ১২০০কৃষকও কৃষিঋণ থেকে বঞ্চিত। তার ভাষ্য, কৃষিঋণের অভাবে অনেক কৃষক দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে আগাম কম দামে কাজুবাদাম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কাজুবাদাম চাষিদের জন্য কৃষিঋণের ব্যবস্থা করার জোর দাবী জানান তিনি।
বান্দরবান কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২হাজার ৫৫৬হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম আবাদ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ১হাজার ৪৬০মেট্রিকটন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২হাজার ৬১৯হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ১হাজার ৬০৬মেট্রিকটন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২হাজার ৭১১হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১হাজার ৭৮১মেট্রিকটন কাজুবাদাম।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন বান্দরবানে কফি ও কাজুবাদাম অত্যন্ত লাভজনক অর্থকরী ফসল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রদর্শনী বাগানও করা হচ্ছে ফলে দিন দিন কাজুবাদামের আবাদ বাড়ছে। তিনি আরও বলেন কাজুবাদাম গাছ রোপনের ৩-৪বছর পর ফলন আসে। তাই এটি সময়সাপেক্ষ হলেও লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা আগ্রহী হচ্ছেন। ভবিষ্যতে আবাদ আরও বাড়বে এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন বলে জানান এই কৃষিবিদ।
আরো পড়ুন→বান্দরবানে প্রথম ধাপে ১,৪৫৬ শিক্ষার্থীকে শিক্ষা বৃত্তি দিলো জেলা পরিষদ


