ঘরে নেই বিদ্যুৎ, নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। বৃষ্টি নামলেই ভাঙা ঘরের ছাদ নিয়ে বাড়ে দুশ্চিন্তা। ভালো বিছানা নেই, অনেক সময় জোটে না দুবেলা খাবারও। এমন মানবেতর পরিস্থিতিতে দিন কাটছে বান্দরবান সদর উপজেলার হাফেজঘোনা এলাকার রুমা স্টেশনের ওপরে বননিবাস হিল রিসোর্ট এলাকায় বসবাসরত লাচিং মারমার তিন সদস্যের পরিবারের।
পরিবারটির বৃদ্ধ বাবা লাচিং মারমা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। অর্থাভাবে করাতে পারছেন না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। তাঁর ছেলে রুল হাই মারমা জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। অন্যদিকে, বৃদ্ধা মা ধনশৌ মারমা বয়সের ভারে অসহায়। অসুস্থ স্বামী ও প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যেই দিন পার করছেন তিনি।
পরিবারটির থাকার মতো ভালো কোনো ঘর নেই। ছোট্ট একটি ঘরে কোনোরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও বৃষ্টি ও বাতাসে সেটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘরে বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর মতো বিছানাও নেই। পরিবারের একটি ছোট দোকান থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত পণ্য নেই, আয়ও সামান্য। ফলে নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরে লাচিং মারমা বলেন, “এই ঘরটা ছাড়া আমাদের থাকার মতো আর কোনো জায়গা নেই। আমি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, হাঁটাচলা করতে পারি না। ওষুধ কেনা ও চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। ঘরে রান্না করার মতো চাল-ডালও অনেক সময় থাকে না। আমার ছেলে জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। আজ পর্যন্ত সরকারি কোনো সাহায্য পাইনি। সরকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে অনুরোধ—আপনারা আমাদের সাহায্য করুন।”
পরিবারটির আরেক সদস্য ধনশৌ মারমার দিন কাটে স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও সংসারের অভাব নিয়ে দুশ্চিন্তায়। তিনি বলেন, “আমরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি। থাকার মতো ভালো একটি ঘর নেই। ঘরে বিদ্যুৎ নেই, পানির ব্যবস্থাও নেই। বৃষ্টি ও বাতাস হলে ঘরটি ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়। আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, তাঁর চিকিৎসা করানোর মতো টাকা নেই। ছেলে প্রতিবন্ধী। এই বয়সে এসে আমি আর কিছু করতে পারছি না। কোনো বিত্তবান ব্যক্তি বা সংগঠন যদি আমাদের পাশে দাঁড়াতেন, তাহলে হয়তো একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারটির আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অনেক সময় ঘরে চাল-ডালও থাকে না। অসুস্থ বাবা চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, প্রতিবন্ধী ছেলে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আর বৃদ্ধা মা বয়সের কারণে কাজ করতে পারছেন না। তাঁদের মতে, সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে পরিবারটির দুর্দশা কিছুটা লাঘব হতে পারে।
পরিবারটির জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরে স্থানীয়রা বলেন, “এই পরিবারটির জীবন খুবই কষ্টের। তাদের থাকার ঘরের অবস্থা ভালো নয়, খাবারেরও অভাব রয়েছে। বাবা অসুস্থ, ছেলে প্রতিবন্ধী, আর মা বৃদ্ধ। সমাজের বিত্তবান মানুষ, বিভিন্ন সংগঠন ও প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ—আপনারা পরিবারটির পাশে দাঁড়ান।”
জীবনের এই কঠিন সময়ে লাচিং মারমার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—একটি নিরাপদ আশ্রয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা খাবার। যে ঘরে বৃষ্টির রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর নিশ্চয়তা নেই, যে পরিবারে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার সামর্থ্য নেই, সেই পরিবারের কাছে সামান্য সহযোগিতাও হয়ে উঠতে পারে নতুন করে বাঁচার অবলম্বন।
লাচিং মারমা ও ধনশৌ মারমা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন। তাঁদের বিশ্বাস, কেউ না কেউ তাঁদের কষ্টের কথা শুনবেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। সরকার, প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সমাজের বিত্তবান মানুষের প্রতি তাঁদের আকুল আবেদন—অসহায় এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান। মানবিক মানুষের সামান্য সহযোগিতায় হয়তো ফিরতে পারে তাঁদের জীবনে স্বস্তি, জ্বলতে পারে আশার আলো।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন