এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সামনে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি আসে, তা হলো—পরবর্তী গন্তব্য কোথায়? দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তুতি নেওয়া, নাকি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করা? বিশেষ করে ফল প্রকাশের সময় ঘনিয়ে এলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারগুলোতে শুরু হয় নানা আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ।
বাস্তবতা হলো, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়—দুই পথেরই নিজস্ব সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই একটিকে সবার জন্য সেরা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, আর্থিক সামর্থ্য, একাডেমিক প্রোফাইল, মানসিক প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিযোগিতার মধ্যেও বড় সুযোগ
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। তুলনামূলকভাবে কম খরচে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার সুযোগ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী, শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এবং দেশের চাকরির বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ—এসব কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ এখনও ব্যাপক।
বিশেষ করে বিসিএস, সরকারি চাকরি কিংবা দেশের কর্পোরেট খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী অনেক শিক্ষার্থীর জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। পাশাপাশি পরিবার থেকে দূরে না গিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগও অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই পথের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তীব্র প্রতিযোগিতা। সীমিত আসনের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলে ভালো ফলাফল থাকা সত্ত্বেও পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় বা বিষয়ে ভর্তি হওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। অনেক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার প্রস্তুতি নিতে হয়, যা সময় ও মানসিক চাপ—দুই দিক থেকেই কঠিন হতে পারে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা: দেশের বাইরে নতুন সম্ভাবনার দরজা
অন্যদিকে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ, আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা, গবেষণার সুবিধা এবং বহুজাতিক ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা এ ক্ষেত্রে বড় আকর্ষণ।
বিদেশে পড়াশোনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো বৈশ্বিক এক্সপোজার। বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একসঙ্গে পড়াশোনা ও কাজ করার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী শুধু একাডেমিক জ্ঞানই অর্জন করেন না; বরং যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারেন।
তবে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সিদ্ধান্তও সহজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশ নির্বাচন, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, প্রয়োজন অনুযায়ী IELTS বা অন্যান্য পরীক্ষার প্রস্তুতি, টিউশন ও জীবনযাত্রার ব্যয়, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, ভিসা প্রক্রিয়া এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি—সবকিছুই বিবেচনায় রাখতে হয়।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনটি প্রশ্ন
এইচএসসির পর কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ধারণের আগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার লক্ষ্য কী? দেশে থেকে ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা থাকলে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথেষ্ট কার্যকর হতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রবেশের লক্ষ্য থাকলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নিজের একাডেমিক প্রোফাইল ও আর্থিক সক্ষমতা কেমন? বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে শুধু ভালো ফলাফল নয়, সঠিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন এবং আর্থিক পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্কলারশিপের সুযোগ থাকলে সেটিও খুঁজে দেখা উচিত।
তৃতীয়ত, প্ল্যান বি কী? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয় বা প্রতিষ্ঠান না পেলে বিকল্প কী হবে? আবার বিদেশে আবেদন করেও যদি কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় বা ভিসা পাওয়া না যায়, তখন কী পরিকল্পনা থাকবে—সেটিও আগে থেকে ঠিক করা দরকার।
এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ দক্ষতা তৈরিতেও মনোযোগ দিতে পারে। ইংরেজিতে যোগাযোগের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, উপস্থাপনা, নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন সফট স্কিল ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবছে, তারা একাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি বিভিন্ন এক্সট্রা-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের প্রোফাইল সমৃদ্ধ করতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয় বা দেশের নির্বাচন ক্যারিয়ারের শেষ সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর যাত্রার শুরু। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হোক কিংবা বিদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়—সফলতার মূল নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর দক্ষতা, পরিশ্রম, মানসিকতা এবং নিজের সুযোগকে কাজে লাগানোর সক্ষমতার ওপর।
তাই ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নাকি বিদেশ’—এই প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। বরং সঠিক প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমার লক্ষ্য, সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে কোন পথটি সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ?”
সেই উত্তর খুঁজে বের করেই নেওয়া উচিত জীবনের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সৈয়দ নাদিমুল আহাসান
CEO: Go-Educate Consultancy
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন