এস এম নাসিম:
৮ জুন ২০২৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৫১৬৬ জন

আস্থার সংকটে চাপ বাড়ছে ইসলামী ব্যাংকে

Copy Link

এস এম নাসিম:
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত পাঁচ কার্যদিবসে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহক। একইসঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন, গ্রাহকের বিক্ষোভ এবং শেয়ারহোল্ডারদের আপত্তিতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই গতকাল সোমবার ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’র আহ্বানে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২ ঘণ্টার কলমবিরতি পালন করেন ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় ব্যাংকিং কার্যক্রম আংশিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে।

ব্যাংকটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তথ্যানুযায়ী, খুরশীদ আলম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে আমানত উত্তোলনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রথম চার কার্যদিবসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। পরে বিভিন্ন শাখা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, এক দিনেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে মোট উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট আমানত নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। তবে ব্যাংকারদের মতে, মোট আমানতের তুলনায় এ পরিমাণ উত্তোলন এখনো তাৎক্ষণিক তারল্য সংকট তৈরির মতো নয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রাহকের মধ্যে আস্থাহীনতার বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
গত ২৪ মে চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করার পর একই দিনে খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তার নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং একাংশ শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর থেকেই ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’র ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, খুরশীদ আলমের দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

* পাঁচ দিনে উত্তোলন প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকা
* কলমবিরতিতে ব্যাংকিং সেবা ব্যাহত
* চেয়ারম্যান অপসারণের দাবিতে আন্দোলন
* পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কয়েক হাজার কোটি টাকা উত্তোলন তাৎক্ষণিক অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করে না। কারণ ব্যাংকটির শক্তিশালী আমানত ভিত্তি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার সুযোগ এবং বিভিন্ন তারল্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে উত্তোলনের ধারা কয়েক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানত প্রত্যাহারের পরিমাণ যদি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে যায় এবং একইসঙ্গে নতুন আমানতের প্রবাহ কমে যায়, তাহলে তা ব্যাংকের স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তখন গ্রাহকের আস্থা ফেরাতে বিশেষ পদক্ষেপ, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন কিংবা নীতিগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রাহক নগদ অর্থ উত্তোলন করছেন নাকি অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে এমন অবস্থায় নেই যে গ্রাহকের উত্তোলনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেবে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের আগস্টেও ব্যাংকটি একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছিল।

কলমবিরতিতে ব্যাহত ব্যাংকিং কার্যক্রম : চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এরই মধ্যে কলমবিরতি কর্মসূচি পালন করেছে। গ্রাহক সংগঠনগুলোও ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করতে হবে এবং ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় আরো সংস্কার আনতে হবে। সচেতন গ্রাহক ফোরামের দাবি, ২ ঘণ্টার কর্মসূচির সময় লেনদেনসহ বেশিরভাগ ব্যাংকিং সেবা বন্ধ ছিল। একইসঙ্গে বিভিন্ন শাখা ও উপশাখার সামনে আমানতকারীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

সরেজমিন মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, মতিঝিল লোকাল অফিস, মতিঝিল শাখা, বাসাবো, শাহজাহানপুর, পল্টন, রমনা, বংশাল, নবাবপুর, ইসলামপুর, সদরঘাট, কামরাঙ্গীরচর, যাত্রাবাড়ী, দনিয়া, দয়াগঞ্জ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, পান্থপথ, কাকরাইল, গেণ্ডারিয়া, ওয়াইজঘাট ও বাংলামোটরসহ বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কলমবিরতি পালন করতে দেখা যায়। ফলে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে এসব স্থানে সাধারণ গ্রাহকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিক বলেন, অবৈধ চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগ, আমানতের সুরক্ষা, গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা, এস আলম গ্রুপ ও তাদের সহযোগীদের অপসারণ এবং গ্রাহকের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদসহ ৭ দফা দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে প্রধান কার্যালয়ের এটিএম বুথসহ বিভিন্ন বুথ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং অনেক আমানতকারী প্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলনে সমস্যার মুখে পড়ছেন। তার দাবি, ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। নুর নবী মানিক আরো বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ ও আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় আগামীতে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি এখন শুধু ব্যাংকিং সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রশাসনিক, করপোরেট এবং রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন চেয়ারম্যান থাকবেন কি থাকবেন না, সেটি নয়; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানতকারীদের আস্থা কত দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়। কারণ ব্যাংকিং ব্যবসার ভিত্তি মূলত বিশ্বাস। গ্রাহকরা যখন মনে করেন তাদের অর্থ নিরাপদ, তখন ব্যাংক শক্তিশালী থাকে। কিন্তু সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যাংকও চাপে পড়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদি আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতা আরো বাড়ে এবং ব্যাংকের কার্যক্রমে এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়, তাহলে চেয়ারম্যানের বিষয়ে পুনর্বিবেচনার চাপ বাড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত উত্তোলনের সঙ্গে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বা সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এ মুহূর্তে ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তারল্য নয়, বরং গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনাই নির্ধারণ করতে পারে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পথচলা।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মানবিক সেবার জন্যে সম্মাননা পেল রাঙ্গামাটি হিল সার্ভিস পরিবার

২৭ বিজিবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আরবি ক্যালিগ্রাফি স্মারক উপহার

বাংলা ভাষা-সাহিত্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র অবদান অনস্বীকার্য: জিয়া হাবীব আহসান

তবলছড়ি বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী আবুল কালামকে সম্মাননা স্মারক প্রদান

বান্দরবানে বিভিন্ন ফলজ ও বনজ চারা বিতরণ করেছে জেলা পরিষদ

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি

আলীকদমে অতিবৃষ্টিতে ভেঙে পড়া বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণে প্রশাসন

কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট বন্ধ, হ্রদের পানির স্তর নেমেছে নিরাপদ পর্যায়ে

রাঙ্গামাটিতে ছাত্রদলের উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দোয়া মাহফিল 

নাইক্ষ্যংছড়িতে খাল খননের সাশ্রয় ১ কোটি ৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত

১০

বিজিবির অভিযানে ৩৮ বোতল কেরু উদ্ধার

১১

প্রথম দফায় ছানি অপারেশন সম্পন্ন, চোখের আলো ফিরে পেলেন ১০০ রোগী

১২

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রেসক্লাবের মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

১৩

নাইক্ষ্যংছড়িতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাবেদ রেজা

১৪

গর্জনিয়া জেনারেল হাসপাতালের ডিরেক্টর বডির সভা অনুষ্ঠিত

১৫

নাইক্ষ্যংছড়ি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সভাপতি হলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান তোফায়েল

১৬

বালাঘাটায় ২০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিলেন ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিন

১৭

কে এস মং–এর উদ্যোগে বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের জন্য আবারও চট্টগ্রাম গেলো ১০০ রোগী

১৮

থানচিতে বিজিবির অভিযানে জেএসএস সদস্য আটক

১৯

নাইক্ষ্যংছড়িতে পাচারের সময় ১০ বার্মিজ গরু জব্দ

২০
error: Content is protected !!