সাড়ে ৫ কোটি টাকায় নির্মিত ভবন চালু হয়নি ৮ বছরেও।এ ভবন হবে উদ্যমী নারী উদ্যোক্তাদের ব্যতিক্রমী বিপণিবিতান এমনই কথা প্রকল্প প্রস্তাবে বলা বলা হয়।’ কিন্তু বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত আট বছরে বিশাল এ বহুতল ভবনটি চালু করা সম্ভব হয়নি নানান বাঁধায়।
এরইমধ্যে (এলজিইডি) নির্মিত এই পরিত্যক্ত ভবনকে সংস্কার করে চালু করতে নতুন বরাদ্দ হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এলজিইডির পর এবার ভবন সংস্কারে এগিয়ে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড! আর এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তৎকালীন পার্বত্য উপদেষ্টার সুদৃষ্টিতে এই বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে দাবি উন্নয়ন বোর্ডের।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ে উন্নয়নের নামে জনগণের অর্থ অপচয়ের অনেক গল্পের মধ্যে একটি- বান্দরবান জয়িতা ভবন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বান্দরবান জেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে ভাণ্ডারীপাড়ার এক ঘুপসি জায়গায় অবস্থান জয়িতা ভবনের। বান্দরবান-কেরানীর হাট সংযোগ সড়কের পাশে ২০ শতক জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি।
২০১৮ সালে ভবনটি নির্মাণ করে এলজিইডি। নাম দেওয়া হয় ‘জয়িতা ভবন’। সে সময় এতে ব্যয় করা হয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
বিভিন্ন নারী সমিতি, নারী উদ্যোক্তা এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, স্থান নির্বাচনে অপরিণামদর্শিতার কারণেই জয়িতা ভবন নারীদের ভাগ্য পরিবর্তন তো দূরের কথা, নারী উন্নয়নেও সামান্য কাজে লাগেনি। গত রবিবার জয়িতা ভবনের বর্তমান অবস্থা দেখতে গিয়ে কথা হয় ভাণ্ডারীপাড়ার পুরনো বাসিন্দা নুরুল হকের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এ জয়িতা ভবনে নারীরা কোনো দোকান খুলেননি। ফলে ভবনটি কুকুর-বিড়ালের আস্তানা হয়ে আছে বছরের পর বছর। শুনেছি ভুতুড়ে ভবনকে চালু করতে আরও দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আচ্ছা ভাই, মরা লাউগাছে পানি ঢাললে সেটা কি আর কদু ফলাতে পারবে?’
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেল-নুরুল হকের এ তথ্য ভুল নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার নির্দেশে জয়িতা প্রকল্পে আরও দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ বরাদ্দ ব্যয় করতে প্রণীত হয়- ‘বান্দরবান সদর উপজেলায় নিবন্ধন করা নারী সমিতিভিত্তিক ব্যতিক্রমী ব্যবসায়ী উদ্যোগ বান্দরবানের পাঁচতলার নারী বিপণিকেন্দ্রের সংস্কার প্রকল্প।’ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত। এ ব্যাপারে সিএইচটিডিবির কোনো কর্মকর্তা অফিসিয়ালি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে অনেক অনুরোধের পর উপসহকারী প্রকৌশলী সোমনাথ চৌধুরী বললেন, ‘প্রকল্পের জন্য টেন্ডার আহ্বান এবং ঠিকাদারের অনুকুলে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানি। তবে এখনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি।’
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের বান্দরবানে দায়িত্বরত উপপরিচালক সুপন চাকমা জানালেন, জয়িতা ভবনে দুটি ভিআইপি কক্ষ, ফুড কোর্ট ও কিডস কর্নার ছাড়াও ৪৫টি দোকান কক্ষ রয়েছে। বান্দরবান সদর উপজেলায় সচল-স্তিমিত মিলিয়ে ৬৪টি রেজিষ্টার্ড মহিলা সমিতি আছে। সব মিলিয়ে এসব সমিতিতে অন্তত দুই হাজার নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন। কিন্তু তারা কেউ এ বিপণিবিতানে দোকান খুলতে আগ্রহী নন।
‘প্রথম বছরে তৎকালীন উপপরিচালক আতিয়া চৌধুরী অনেক চাপাচাপি করে মাত্র আট নারী উদ্যোক্তাকে দোকান কক্ষ নিতে রাজি করাতে পেরেছেন। দোকান নেওয়ার জন্য তারা ব্যাংকে ২০ হাজার টাকাও জমা দিয়েছেন। কিন্তু গত আট বছরে এই আটজনের কেউ পজিশন বুঝে নিতে আসেননি’- যোগ করলেন সুপন চাকমা।
জয়িতা ভবন পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানালেন, দরজা-জানালায় লাগানো গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে। চুরি হয়ে গেছে ভিআইপি কক্ষের এয়ার কন্ডিশনার, আসবাব ও মূল্যবান ফিটিংস। ফুড কোর্ট এবং কিডস কর্নারে সন্নিবেশিত কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কোনো তদারকি বা নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় ভবনের রেলিং থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে গ্রিল।
জয়িতা ভবন চালুর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড নতুন করে আবার বরাদ্দ দিয়েছে। এ টাকায় জয়িতা ভবন সংস্কার করে চালু করা সম্ভব কি না- জানতে চাইলে উপপরিচালক সুপন চাকমা বললেন, ‘সরকারি পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য করার সুযোগ আমার নেই। কিন্তু দুই বছর বান্দরবানে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হচ্ছে, অবস্থানগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণে জয়িতা ভবনে নারীদের বিপণিবিতান চালু।
আরো পড়ুন→বান্দরবানে আগামী শনিবার বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন