সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণী হিমালয়ের দুর্গম পথ পেরিয়ে সাইকেলে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছেছেন বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের তরুণ সাইক্লিস্ট বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা। বৃষ্টি, তুষারপাত, হিমেল বাতাস, দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং উচ্চতার কারণে অক্সিজেনের স্বল্পতাজনিত শ্বাসকষ্ট—সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে ২২ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে তিনি পৌঁছান তাঁর স্বপ্নের গন্তব্য এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (ইবিসি)-এ।
‘সি টু হিমালয়াস — এক্সপেডিশন ফর অ্যাওয়ারনেস’ শিরোনামের এই অভিযাত্রায় বীর কুমারের যাত্রা শুরু হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের কক্সবাজার জিরো পয়েন্ট থেকে। বাই রোডে সাইকেল চালিয়ে দীর্ঘ ৩৮ দিনের পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছান ৫,৩৬৪ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে।
বীর কুমারের দাবি অনুযায়ী, স্থলপথে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেলে করে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানো প্রথম বাংলাদেশি এবং প্রথম আদিবাসী সাইক্লিস্ট হিসেবে তিনি এই অভিযানের মাধ্যমে নতুন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগে অভিযানের বিভিন্ন ধাপে তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছে একাধিক কঠিন উচ্চতর পর্বত ও পাস। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে তিনি ৫,০৮৩ মিটার উচ্চতার নাংকার্টশাং পিক সামিট করেন। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা ৫১ মিনিটে ৫,৫৫০ মিটার উচ্চতার ছুখুং রি পিক জয় করেন।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে তিনি ৫,৫৩৫ মিটার উচ্চতার কংমা লা পাস অতিক্রম করেন। সর্বশেষ ২২ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ৫,৩৬৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে সাইকেল নিয়ে পৌঁছে অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ সম্পন্ন করেন।
তবে বীর কুমারের কাছে এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের যাত্রা নয়। অভিযানের সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন রক্তদান ও জলবায়ু ন্যায়বিচার বিষয়ে সচেতনতার বার্তা। তাঁর অভিযানের মূল ভাবন—“প্যাডেল ফর — ডোনেট ব্লাড • ক্লাইমেট জাস্টিস”।
বাংলাদেশের তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর একজন তরুণ হিসেবে বীর কুমারের এই অভিযাত্রা পার্বত্য চট্টগ্রামের তরুণদের স্বপ্ন, সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৪৫,৯৭২ জন। সেই জনগোষ্ঠী থেকে উঠে এসে দেশের পতাকা বহন করে হিমালয়ের দুর্গম পথে সাইকেল চালানোর এই প্রচেষ্টা তাঁর সম্প্রদায়ের কাছেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছে বীর কুমার তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “স্বপ্নের এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে অবশেষে আমি ! স্বপ্ন বড় হলে পথ যত কঠিনই হোক, থেমে যাওয়া যায় না।”
অভিযাত্রার এই পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য তিনি তাঁর পরিবার, শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোগী ও সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও সহযোগিতাই দুর্গম এই পথ পাড়ি দেওয়ার অন্যতম শক্তি।তবে এখানেই শেষ নয় বীর কুমারের পথচলা। সামনে আরও কিছু চ্যালেঞ্জ ও স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য রয়েছে তাঁর। দেশের পতাকা সঙ্গে নিয়ে বাকি পথও সফলভাবে সম্পন্ন করে দেশে ফেরার প্রত্যাশা তাঁর।
সমুদ্রের নীল থেকে হিমালয়ের সাদা—একটি সাইকেল, একটি পতাকা এবং একটি বড় স্বপ্ন নিয়ে বীর কুমারের এই অভিযাত্রা যেন বলে যায়, পথ যত দুর্গমই হোক, স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস থাকলে অসম্ভবকেও ছোঁয়া সম্ভব।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন