সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বান্দরবান পার্বত্য জেলা। পাহাড়ি ঝর্ণা ও সবুজ পাহাড়ের কোলে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সুদীর্ঘ সহাবস্থানের পাশাপাশি অন্যতম আদিবাসী হলো ‘তঞ্চঙ্গ্যা’। নিজস্ব সমৃদ্ধ জীবনধারা, সংস্কৃতি ও বর্ণমালায় সমৃদ্ধ এই জনগোষ্ঠী পার্বত্য অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে করেছে আরও বর্ণিল।
তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও আদি নিবাস হলো বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলার বিখ্যাত ‘তৈনছড়ি বা তৈনগাং । শত শত বছর ধরে তৈনছড়ি বা তৈনগাং চারপাশেই গড়ে উঠেছিল এই জনগোষ্ঠীর প্রাচীন বসতি ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রবিন্দু।
ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র ও গবেষকদের বিবরণ অনুযায়ী, আজ থেকে ছয় শতাধিক বছর আগে—১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিগ্রহের শিকার হয়ে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী নিরাপত্তার খোঁজে উত্তর দিকে সীমানা পেরিয়ে আগমন করে। তৎকালীন চট্টগ্রামের শাসক জামাল উদ্দিনের শরণাপন্ জুগিয়ে চলেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ২০২২ সালের ষষ্ঠ সরকারি জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের মোট জনসংখ্যা ১,৯৭৭ জন।
উপজেলার সামগ্রিক জনসংখ্যার তুলনায় শতকরা হিসেবে আলীকদম উপজেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩.১০ শতাংশ মানুষ তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
আলীকদমের ‘তৈনগাং’ নদীর অববাহিকাকে তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদি নিবাস ও পরিচয়ের উৎস বিবেচনা করা হলেও, আধুনিক জনমিতিক চিত্রে দেখা যায় যে তাঁরা বর্তমানে এলাকার একটি আদি জনগোষ্ঠী হিসেবে অবস্থান করছেন। তবে তুলনা মূলকভাবে জনসংখ্যার শতকরা হার কম হলেও আলীকদমের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্থানীয় কৃষি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অবদান অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
কালক্রমে জীবন জীবিকা, ভৌগোলিক পরিবর্তন ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে এই আদি নিবাস ছেড়ে তারা চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে বান্দরবান সদর, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং এমনকি কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চলেও তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর সুসংগঠিত বসতি রয়েছে। তবে ভৌগোলিক বিস্তারের এই চিত্রের মাঝে একটি বড় বৈষম্য ফুটে উঠেছে শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য জেলা ও উপজেলার তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখা যায়—তারা শিক্ষা-দীক্ষা, সরকারি-বেসরকারি চাকরি এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছেন। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান সদরে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা তরুণ প্রজন্ম উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে গিয়ে নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।
কিন্তু এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় তাঁদেরই আদি জন্মভূমি তৈনছড়ি বা তৈনগাং। যে তৈনগাং নদীর অববাহিকাকে তাঁদের ইতিহাসের প্রাণকেন্দ্র মনে করা হয়, সেখানকার তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারগুলো আধুনিক শিক্ষার আলো ও সার্বিক উন্নয়ন সুবিধা থেকে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন