পাহাড় কন্ঠ ডেস্ক
১৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ২৮২ জন

‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে দুই মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে ২৫ সংগঠনের যৌথ বিবৃতি

Copy Link

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও পরিচয় নিয়ে সরকারের দুই মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে দেশের ২৫টি আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। সংগঠনগুলোর দাবি, মন্ত্রীদের বক্তব্য ইতিহাস, বাস্তবতা ও বাংলাদেশের বহুজাতিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলো ‘বাংলাদেশে আদিবাসী বলতে কেউ নেই’ এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক—এ ধরনের বক্তব্যকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বক্তব্য দেন।

সেখানে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সবার একটাই পরিচয়—‘বাংলাদেশী’; এ দেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই। অন্যদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন।

যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনগুলো বলেছে, এ ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পঞ্চাশের অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা নিয়ে এ ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে।

মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করে সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো সরকারই আদিবাসীদের ন্যায্য সাংবিধানিক, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে তারা বর্তমানে অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সংকটের মুখোমুখি।

যৌথ বিবৃতিতে জাতিসংঘের আদিবাসী জনগণের অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP), ২০০৭-এর প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। সংগঠনগুলোর দাবি, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকেও আদিবাসী জনগণের অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার ও নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঘোষণাপত্রটি গৃহীত হওয়ার সময় অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে দেশগুলো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে ঘোষণাপত্রকে সমর্থন করে। তাই বাংলাদেশকেও আদিবাসীদের অধিকার ও আত্মপরিচয় রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদের ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় সম্পৃক্ত করার’ বক্তব্যেরও সমালোচনা করেছে সংগঠনগুলো।

তাদের ভাষ্য, আদিবাসীদের নিজস্ব জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে ‘মূলধারায় সম্পৃক্তকরণ’ ধারণাটি যদি তাদের স্বাতন্ত্র্য বিলুপ্ত করে বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে একীভূত করার দিকে পরিচালিত হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের অবস্থান বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার ‘রেইনবো-নেশন’ ধারণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চার দফা দাবি

আদিবাসীদের অস্তিত্ব, অধিকার ও আত্মপরিচয় রক্ষায় সরকারকে চার দফা দাবি জানিয়েছে ২৫টি সংগঠন। দাবিগুলো হলো—

১. সাংবিধানিক স্বীকৃতি: বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

২. ভূমি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার: আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৩. সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সুরক্ষা: আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নিজস্ব জ্ঞান সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন: ২০০৭ সালে জাতিসংঘ গৃহীত আদিবাসী জনগণের অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ২৫টি সংগঠনের মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস), বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আদিবাসী শিক্ষার্থী সংগঠনসহ অন্যান্য ছাত্র ও যুব ফোরাম।

বিবৃতিতে সংগঠনগুলো সরকারের প্রতি ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে আদিবাসীদের পরিচয়, অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে অবিলম্বে চার দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।

আরো পড়ুন→এইচএসসির পর দ্বিধাদ্বন্দ্ব: দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নাকি বিদেশে উচ্চশিক্ষা?

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকার ইয়াবা উদ্ধার

১

পার্বত্য তিন কমিটি বাতিলের দাবিতে নাগরিক সমাবেশের ডাক দিয়েছে পিসিসিবিএ

২

সম্প্রীতির বান্দরবান ফুটবল টুর্নামেন্টে সদর উপজেলার শিরোপা জয়

৩

জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসায় শায়খ জয়নুল আবেদীন আল-কাদেরীকে সম্মাননা

৪

নতুন দায়িত্ব পেলেন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

৫

সাজেকে ইউপিডিএফ-জেএসএস সংঘাতে শিশু গুলিবিদ্ধের ঘটনায় পিসিসিপির নিন্দা

৬

দেশজুড়ে দখল-চাঁদাবাজি ও হামলা নিয়ে ৩৮ নাগরিকের উদ্বেগ

৭

রুমায় পানির সংকট নিরসনে সেনাবাহিনী কর্তৃক ১ লক্ষ লিটারের ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ

৮

বিলাইছড়িতে বিজিবির ওপর হামলার অভিযোগ, পিসিসিপির নিন্দা

৯

আবারো বান্দরবানে ফিরেছেন ওষুধ সাপ্লাই কাণ্ডে বিতর্কিত সিভিল সার্জন

১০

আবারো বান্দরবানে ফিরেছেন ওষুধ সাপ্লাই কাণ্ডে বিতর্কিত সিভিল সার্জন

১১

নাইক্ষ্যংছড়িতে বসতবাড়ি থেকে ১০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার, মালিক পলাতক

১২

নাইক্ষ্যংছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী-সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত

১৩

আলীকদমে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ

১৪

বান্দরবানে এনসিপি নেতা মিজানুর রহমান আখন্দের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি

১৫

৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই পিডি নজরুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গায় বদলি

১৬

নাইক্ষ্যংছড়িতে মসজিদের শৌচাগারে পাওয়া গেলো ব্যবসায়ীর মরদেহ

১৭

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিন কমিটি বাতিলসহ ৪ দফা দাবি জেএসএসের

১৮

লামায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দিনমজুরের লাশ উদ্ধার

১৯

গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা গেলো ধর্মপুর একাদশের ঘরে

২০
error: Content is protected !!