বাবুল খাঁনঃ বাংলাদেশে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি চরম সত্য বারবার উঠে এসেছে—তা হলো ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও শাসনতান্ত্রিক চরিত্রের বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। যে আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষ বুক বাঁধে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা দলীয় স্বার্থের কাছে বিলীন হয়ে যায়।
প্রশাসনের দলীয়করণ: রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডে আঘাত
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ এবং জনমুখী। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সরকার গঠনের পরপরই শুরু হয় প্রশাসনের নজিরবিহীন দলীয়করণ। পদোন্নতি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়ন—সবক্ষেত্রেই মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাধান্য পায়। যখন সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ও সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংকুচিত গণতন্ত্র
গণতন্ত্রের প্রাণ হলো বাকস্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতায় থাকা দলটি প্রায়শই ভিন্নমত দমনকে তাদের প্রধান কৌশলে পরিণত করে। ডিজিটাল মাধ্যম হোক কিংবা রাজপথ, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখবে তাদের কথা বলার অধিকার সীমিত, তখন সেখানে ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ কেবল একটি কাগুজে তকমা ছাড়া আর কিছুই নয়।
দলীয় এজেন্ডা বনাম জনস্বার্থ
রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনসেবা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ক্ষমতার মসনদে বসার পর তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন নিজস্ব ও দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে। উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধাভোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা—সবখানেই দলীয় ক্যাডারদের আধিপত্য পরিলক্ষিত হয়। এই ক্ষমতার দাপট সাধারণ জনগণের অধিকারকে সুরক্ষিত করার পরিবর্তে তাদের আরও বেশি কোণঠাসা করে ফেলে।
প্রতিশ্রুতির ভাঙাগড়া: জনগণের অধিকারের জায়গা কোথায়?
ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে গণতন্ত্র রক্ষা ও মানবাধিকার সুরক্ষার দীর্ঘ তালিকা পেশ করে। কিন্তু সরকার গঠনের পর সেই ‘কথা রাখা’র সংস্কৃতি আর টিকে থাকে না। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল মুখগুলো বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের কষ্ট ও অধিকারহীনতার চিত্রটি অপরিবর্তিত থেকে যায়।
এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অপরিহার্য।
গণতন্ত্র মানে কেবল পাঁচ বছর অন্তর ভোট দেওয়া নয়; গণতন্ত্র মানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকারের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা। যতদিন পর্যন্ত দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থকে স্থান দেওয়া হবে না, ততদিন প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকারের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ সেই দিনটির অপেক্ষায়, যেখানে ক্ষমতা হবে সেবার মাধ্যম, শোষণের অস্ত্র নয়।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন