Logo
বাংলাদেশ[bangla_day] , [english_date]
  1. অনিয়ম
  2. অপরাধ
  3. অপহরণ
  4. অর্থনীতি
  5. আইন শৃঙ্খলা
  6. আইন-আদালত
  7. আওয়ামীলীগ
  8. আন্তর্জাতিক
  9. আলীকদম
  10. ইতিহাস ও গল্প

প্রধানমন্ত্রীর নিকট খোলা চিঠি

কাজী শাহাজাদা
আপডেট : February 23, 2026
Link Copied!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র কর্তৃক সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডে নিহত নিরীহ ছাত্রদের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত দ্বিতীয় স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। জাতির এই ক্লান্তিকালে বৈষম্যবিরোধী জনগণ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আপনার ওপর ভরসা করেছে। এ দেশের মানুষ আপনাকে আপন করে নিয়েছে। সে কারণে আপনার প্রতি জাতির আকাশসম প্রত্যাশা।

একবিংশ শতাব্দীর জেন-জি প্রজন্ম প্রথাগত রাজনীতি পছন্দ করে না; তারা গতিশীল ও ফলপ্রসূ রাজনীতি প্রত্যাশা করে। ইতোমধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনার কয়েক দিনের কর্মকাণ্ড—বিশেষ করে ডিউটি-ফ্রি গাড়ি ক্রয় না করার সিদ্ধান্ত—সাধারণ জনগণ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

দেশবাসী আপনাকে দায়িত্বে পেয়ে যেমন আশাবাদী, তেমনি স্বৈরশাসকের নিয়োজিত কিছু আমলা আজও প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন—এ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। আপনার চারপাশে স্বৈরাচারের প্রভাবমুক্ত একটি প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সকল মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপারসহ মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।

বিগত বছরগুলোতে যারা জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও পেশাদার ও নিরপেক্ষভাবে পুনর্গঠন জরুরি। ক্যাডার সার্ভিসে যারা স্বৈরাচারী সরকারের রোষানলে পড়ে দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। তবে বাস্তবে আমরা সে রকম কার্যকর পদক্ষেপ দেখছি না। কেবল প্রশাসন ক্যাডারের কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেও অন্যান্য ২৫টি ক্যাডারের অনেকেই এখনও বঞ্চিত। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদসহ অন্যান্য পেশাজীবীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আন্তঃক্যাডার বৈষম্য কমানো এখন সময়ের দাবি। এই বৈষম্যের কারণেই প্রকৌশল ও চিকিৎসাশাস্ত্রের অনেকেই প্রশাসন ক্যাডারের দিকে ঝুঁকছেন—গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

এখনও স্বৈরাচারী সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা সচিব ও সিনিয়র সচিব পদে বহাল রয়েছেন। অথচ তাঁদের পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল প্রবল। প্রশাসন ও পুলিশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অতীত সরকারের জন্য যেমন সমস্যার কারণ হয়েছিল, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেও সে অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

নবনির্বাচিত মন্ত্রীদের ছয় মাস পর মূল্যায়নের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। অনুরূপ মূল্যায়নব্যবস্থা সচিবদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। অনেক সময় সচিবরা আন্তঃক্যাডার ও আন্তঃদপ্তরীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেন এবং নন-ক্যাডার থেকে আগতদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। অযোগ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় পদায়ন করা হয়, যা প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসনের পরিপন্থী।

দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের জন্য শিক্ষাখাতকে আমূল সংস্কার করা প্রয়োজন। পাঠ্যক্রম সংস্কারের পাশাপাশি প্রয়োজন গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষক। মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতনস্কেল চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকদের পরিবর্তে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই অধিকাংশ প্রশিক্ষণের সুযোগ পান—যা পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি জনমহলে আলোচিত হচ্ছে। অতীতের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে অনেকে বাংলাদেশ পুলিশের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছেন—যেমন ‘বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র গার্ড (Bangladesh Home Guard – BHG)’ বা অন্য কোনো উপযুক্ত নাম। বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বিগত ১৬ বছরে নজিরবিহীন দুর্নীতি, কালো টাকা সঞ্চয় ও অর্থপাচারের ফলে দেশের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি, টেন্ডারবাজ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর অভিযান পরিচালনা প্রয়োজন। অবৈধ সম্পদ ক্রোক করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া উচিত। এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি জনগণ প্রত্যাশা করে।

অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমানো জরুরি। ভ্রমণ ব্যয়, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালার ব্যয় ২৫% থেকে ৪০% পর্যন্ত কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। অর্থ বিভাগ থেকে এ বিষয়ে পরিপত্র জারি করা প্রয়োজন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিরস্ত্র ছাত্রদের হত্যাকাণ্ডের বিচার সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে দেশবাসী প্রত্যাশী।

২০০৮ সাল থেকে বহু রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিক নানা মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহার করা হলে তা হবে মহানুভবতার দৃষ্টান্ত। পাশাপাশি সীমান্ত পরিস্থিতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে দৃঢ়, মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। অতীতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কার্যক্রম পুনরায় চালু ও স্বাধীনভাবে পরিচালনার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাজারব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। চাঁদাবাজি ও আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আইসিটি খাতে নজরদারি জোরদার করে বটবাহিনী ও অপপ্রচার প্রতিরোধ করতে হবে, যাতে সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি না হয়।