নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৩৮ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ১৩১ জন

এম এন লারমা সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন: ড. আমেনা মহসিন

Copy Link

বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘জাত্যভিমানী সংবিধানের খেরোখাতায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান মিলনায়তনে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি-২০২৬ আয়োজিত অনুষ্ঠানে সদস্য সচিব মনিরা ত্রিপুরার সঞ্চালনায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক, গবেষক ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও কলামিস্ট ড. মারুফ মল্লিক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা।

আলোচনায় ড. আমেনা মহসিন বলেন, পাহাড়িদের যে অস্থির সংকট বর্তমানে তৈরি হচ্ছে, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও তা ছিল। সে সময় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি ভিন্ন জাতির মানুষের হয়ে একাই তাদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন। একইসঙ্গে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা তুলে ধরে সংবিধানের ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন। এম এন লারমা তাঁর সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন।তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জায়গায় কতটুকু অন্তর্ভুক্তি সম্ভব, সেটিও প্রশ্ন থেকে যায়। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে কতটুকু গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে, সেসব বিষয়ও তুলে আনা প্রয়োজন।

গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অধিকার সম্পর্কিত অতি ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর সঙ্গেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন জড়িত, যা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। বর্তমান সময়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে জনপদগুলো যখন বিপর্যস্ত হচ্ছে, তখন লারমার পরিবেশ-প্রতিবেশ দর্শনের প্রাসঙ্গিকতাও উঠে আসে।নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, লারমার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে দস্তিদার পরিবার খুব কাছ থেকে সম্পৃক্ত ছিল। ষাটের দশকে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার স্থান থেকে অনতিদূরেই ছিল তাদের বাড়ি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, বিএনপি ও তারেক রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ স্পষ্ট নয়, বরং ধোঁয়াশাপূর্ণ। এর চেয়ে লারমার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শন অধিক স্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় গণপরিষদে সেই কথাই বলেছিলেন।

বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচি ও ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, এসব বাস্তবায়ন না করে বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে সামরিক বাহিনী, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের সমন্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিপীড়ক কমিটি গঠন করছে। এছাড়া পার্বত্য চুক্তির ফলে সৃষ্ট পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী বসিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নতুন নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হোক, আদিবাসীরা আদিবাসীই। নানা ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয় অধিকারকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারের দখলদার চরিত্রের পরিবর্তন হয় না। বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হলেও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন পর্যালোচনা করা উচিত।

ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক ব্যক্তির বাণিজ্যিক খুঁটি হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও মুনাফা অর্জন করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকীকরণ ও সেটেলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তা সত্ত্বেও প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান দর্শনের মাধ্যমে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালন করা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। গণপরিষদ বিতর্ক থেকে বোঝা যায়, তিনি কার্যত বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট ড. মারুফ মল্লিক বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সংবিধানে চাপিয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি রাষ্ট্রে বহুত্ববাদী অন্তর্ভুক্তির পথে অন্তরায়। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময় এম এন লারমার দর্শন বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রের কাছেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর পুরোনো ভুলগুলো সংশোধনের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার জবাবদিহিতার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে এবং ‘রেইনবো নেশন’ প্রক্রিয়ার মধ্যে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, তাহলে নতুন কিছু আশা করা যায়।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন বাংলাদেশের সংবিধানের ‘আলাম’ (চাকমাদের বুননশিল্প)। বাঙালি ছাড়া অন্যান্য জাতিসমূহের অস্তিত্ব অস্বীকার করে রাষ্ট্র বাঙালি কর্তৃত্ববাদের জাত্যভিমানী চরিত্রকে জাহির করছে।

তিনি বলেন, এম এন লারমার সংবিধান দর্শনে জুম ও কৃষিচাষ, রাজস্ব আদায়, উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃষি প্রশ্ন, পরিবেশ-প্রতিবেশ, শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং নারী প্রশ্নসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসবই একটি বৈজ্ঞানিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের ধারক-বাহক, যা বর্তমান সময়েও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের প্রসঙ্গ তুলে পাভেল পার্থ বলেন, পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে ভূমি অধিগ্রহণ, বিশাল জনপদ, চাষযোগ্য ভূমি, শস্য ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশ ধ্বংসের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার আগাম বার্তাও লারমার পরিবেশ ও সমাজ দর্শনে প্রতিফলিত হয়েছিল।

আদিবাসী স্বীকৃতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটি জাতিসংঘের চাপিয়ে দেওয়া ন্যারেটিভ—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলেও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আদিবাসীদের অস্তিত্ব আরও বহু প্রাচীন। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ সংসদ ভবন ও দেশের প্রথম বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার স্থানসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ তুলে ধরেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আদিবাসী-বাঙালির ঐতিহাসিক সম্প্রীতি অস্বীকার করে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’সহ নানা পরিচয়ের বাইনারি ন্যারেটিভের মাধ্যমে রাষ্ট্র ঔপনিবেশিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে বদ্ধপরিকর।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকার ইয়াবা উদ্ধার

১

পার্বত্য তিন কমিটি বাতিলের দাবিতে নাগরিক সমাবেশের ডাক দিয়েছে পিসিসিবিএ

২

সম্প্রীতির বান্দরবান ফুটবল টুর্নামেন্টে সদর উপজেলার শিরোপা জয়

৩

জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসায় শায়খ জয়নুল আবেদীন আল-কাদেরীকে সম্মাননা

৪

নতুন দায়িত্ব পেলেন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

৫

সাজেকে ইউপিডিএফ-জেএসএস সংঘাতে শিশু গুলিবিদ্ধের ঘটনায় পিসিসিপির নিন্দা

৬

দেশজুড়ে দখল-চাঁদাবাজি ও হামলা নিয়ে ৩৮ নাগরিকের উদ্বেগ

৭

রুমায় পানির সংকট নিরসনে সেনাবাহিনী কর্তৃক ১ লক্ষ লিটারের ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ

৮

বিলাইছড়িতে বিজিবির ওপর হামলার অভিযোগ, পিসিসিপির নিন্দা

৯

আবারো বান্দরবানে ফিরেছেন ওষুধ সাপ্লাই কাণ্ডে বিতর্কিত সিভিল সার্জন

১০

আবারো বান্দরবানে ফিরেছেন ওষুধ সাপ্লাই কাণ্ডে বিতর্কিত সিভিল সার্জন

১১

নাইক্ষ্যংছড়িতে বসতবাড়ি থেকে ১০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার, মালিক পলাতক

১২

নাইক্ষ্যংছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী-সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত

১৩

আলীকদমে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ

১৪

বান্দরবানে এনসিপি নেতা মিজানুর রহমান আখন্দের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি

১৫

৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই পিডি নজরুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গায় বদলি

১৬

নাইক্ষ্যংছড়িতে মসজিদের শৌচাগারে পাওয়া গেলো ব্যবসায়ীর মরদেহ

১৭

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিন কমিটি বাতিলসহ ৪ দফা দাবি জেএসএসের

১৮

লামায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দিনমজুরের লাশ উদ্ধার

১৯

গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা গেলো ধর্মপুর একাদশের ঘরে

২০
error: Content is protected !!