চনুমং মারমা, রুমা: বান্দরবানের রুমা উপজেলা সদরের থানাপাড়া এলাকায় সেন্ট আন্তনী ক্যাথলিক গির্জা পরিচালিত একটি হোস্টেল থেকে সাঙ্গু নদীতে গোসল করতে গিয়ে পাইংরুং ম্রো (৯) নামক দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়েছে। গতকাল ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলের দিকে কৈক্ষ্যংঝিরি এলাকায় সাঙ্গু নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।নিহত পাইংরুং ম্রো দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করত। তার বাবার নাম পকসিং ম্রো। তাদের বাড়ি টুংগীপাড়া এলাকায় বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানাযায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে পাইংরুং ম্রোসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী সাঙ্গু নদীর ঘাটে গোসল করতে যায়। একপর্যায়ে পাইংরুং পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয়। এরপর স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয় এবং একদিন পর আজ সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর হোস্টেলে থাকা শিশু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, হোস্টেলে অল্প বয়সী শিশু শিক্ষার্থীরা অবস্থান করলেও তাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
জানা গেছে, হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের দেখাশোনার দায়িত্বে চারজন শিক্ষক রয়েছেন। তারা হলেন—বিউটি চিরান, লাজারুজ ত্রিপুরা, রোজিনা ত্রিপুরা ও জ্যোতি ত্রিপুরা।স্থানীয়দের প্রশ্ন, এতজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও মাত্র নয় বছর বয়সী একটি শিশু কীভাবে হোস্টেল থেকে বের হয়ে সাঙ্গু নদীর ঘাটে গেল এবং সেখানে গোসল করতে গিয়ে নিখোঁজ হলো—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
হোস্টেলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, নিয়মিত গোসলের জন্য হোস্টেলের ভেতরে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাদের অনেক সময় বাইরে নদীর ঘাটে গিয়ে গোসল করতে হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের হোস্টেলে গোসল করতে দেওয়া হয় না। তাই বাইরে সাঙ্গু নদীর ঘাটে গিয়ে গোসল করতে হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের এক ইউপি সদস্য অভিযোগ করে বলেন, হোস্টেলে ছোট ছোট শিশু শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো যথাযথ ব্যবস্থা নেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা নিয়মিত ও যথাযথভাবে শিক্ষার্থীদের দেখভাল করলে এত অল্প বয়সী একজন শিশু কীভাবে হোস্টেল থেকে নদীর ঘাটে পৌঁছাল, সেটি তদন্তের বিষয়।তিনি আরও বলেন, হোস্টেলের ভেতরে শিশুদের নিরাপদে গোসলের ব্যবস্থা না থাকলে এবং নদীতে গোসলের সময় পর্যাপ্ত তদারকি না থাকলে শিশুদের আবাসিক হোস্টেল পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বশীল পর্যায়ের একজন ব্যক্তি কর্তৃপক্ষকে যথাযথভাবে অবহিত না করে প্রায় এক মাস ধরে দায়িত্বের বাইরে থাকায় হোস্টেলের ব্যবস্থাপনা ও তদারকিতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
হোস্টেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জন ত্রিপুরা বলেন, ইনচার্জ না থাকায় বর্তমানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দেখাশোনা করছেন। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন স্কুলের শিক্ষক বলেও জানান তিনি।পাইংরুংয়ের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন সকালে তার মা-বাবা বান্দরবান যাওয়ার পথে সন্তানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পরে বিকেলে সন্তানের পানিতে ডুবে নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে তারা মর্মাহত হয়ে পড়েন।
এ বিষয়ে বলীপাড়া মিশন হোস্টেলের ফাদার সিটল বলেন, “আমাদের এই হোস্টেলের ইনচার্জ হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি গত মাস থেকে কর্তৃপক্ষকে কোনো ধরনের অবহিত না করে নিজের ইচ্ছামতো দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। এ ঘটনায় আমরা সবাই মানসিকভাবে খারাপ অবস্থায় আছি।”তিনি আরও বলেন, “হোস্টেলের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কিছুটা অবহেলা রয়েছে বলে আমরা মনে করছি। বিশেষ করে এখানে থাকা ছোট ছোট শিশুদের নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক তদারকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিচালনা ও নিয়মিত তদারকি করা হলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা হয়তো ঘটত না।
স্থানীয়দের মতে, ঘটনাটিকে শুধু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের দায়িত্বে অবহেলা, পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতি কিংবা ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা জরুরি।
একই সঙ্গে হোস্টেলে থাকা শিশুদের জন্য নিরাপদ পানি, গোসলের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত তদারকি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং হোস্টেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। পাশাপাশি নিখোঁজ শিশু পাইংরুং ম্রোকে দ্রুত উদ্ধার এবং ভবিষ্যতে আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শিশুদের নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে দায়িত্বে অবহেলার কোনো অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং হোস্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জরুরি সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন