রাজধানীর মিরপুরে দুই দিনব্যাপী ৫ম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) মিরপুর-১৩-তে পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ মেলার উদ্বোধন করেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।
উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ ও আদিবাসী সুহৃদদের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন। সংস্কৃতিকর্মী তনয়া দেওয়ানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও মানবাধিকারকর্মী শিরিন পারভিন হক এবং অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপেন দেওয়ান বলেন, আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্য দেশের অন্যান্য মানুষের কাছে তুলে ধরার এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এ মেলা থেকে আদিবাসীদের জীবনধারা, খাদ্যসংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার এবং শেখার সুযোগ রয়েছে। বাঙালির পাশাপাশি দেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এবং তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতির চিত্র এ আয়োজনের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস দেশের সম্পদ, যা জাতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
তিনি আরও বলেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। পাহাড়ে উৎপাদিত পণ্য দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে। আদিবাসী শব্দটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ শব্দের মাধ্যমে স্বতন্ত্র রীতিনীতি ও পরিচয়ের প্রতিফলন ঘটে। আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ মেলা বৃহৎ পরিসরে আদিবাসীদের পরিচয় তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিরিন পারভিন হক বলেন, এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা তুলে ধরা হচ্ছে। দেশে খাদ্যে ভেজালের বিস্তারের বিপরীতে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য এখনো অনেকাংশে নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত। নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা সংরক্ষণের পাশাপাশি আদিবাসীদের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পাহাড়ের মানুষের খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা ভূমির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অথচ তাদের ভূমির অধিকার এখনো যথাযথভাবে স্বীকৃত নয়। প্রতিনিয়ত ভূমি দখলের কারণে অনেকেই উৎপাদনব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা বলেন, আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনপদ্ধতি সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে এ মেলা সময়োপযোগী উদ্যোগ। আদিবাসীদের খাদ্য উৎপাদনপদ্ধতি সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক থাকায় তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, আদিবাসীরা এ দেশেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা সবার দায়িত্ব। এ ধরনের আয়োজনের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে রাজধানী ঢাকায় আদিবাসীদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য একটি পৃথক বাজার গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগ আদিবাসী সংস্কৃতিকে বৃহত্তর সমাজের কাছে আপন করে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
আলোচনা পর্ব শেষে প্রধান অতিথি অন্যান্য অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে বেলুন উড়িয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
দুই দিনব্যাপী এ মেলায় পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত খাদ্যশস্য, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও নানা পণ্যের সমাহার ঘটেছে। পাহাড়ের জনপ্রিয় ব্যাম্বু শুট, কলাপাতায় রান্না করা বিভিন্ন পদের হেবাং, জুমের সবজি এবং ঐতিহ্যবাহী পাজনসহ নানা মুখরোচক খাবার পাওয়া যাচ্ছে মেলায়। পাশাপাশি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মনিপুরী, গারো ও রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও তাঁদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন। রাখাইন সম্প্রদায়ের কালো ও সাদা বিনি চালের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পিঠা এবং বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নানা ধরনের মুন্ডি মেলার অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
আয়োজকদের তথ্যমতে, মেলাটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। দুই দিনই সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয়েছে মনোজ্ঞ আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এতে বাংলাদেশ আইডল মং, পাহাড়ের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা এবং গারো শিল্পী মার্কুস চিসিম সংগীত পরিবেশন করবেন। পাশাপাশি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনারও আয়োজন রয়েছে।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন