চনুমং মারমা, রুমা
৬ নভেম্বর ২০২৬, ৫:৪৩ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৯৯ জন

রুমায় কোলাদি মৌজার হেডম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ‎

Copy Link

 

বান্দরবানের রুমায় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে ৩৫৩ নং কোলাদি মৌজার হেডম্যান শৈচিং থুই মারমার বিরুদ্ধে। শুধু জমি দখলের চেষ্টা নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের জমিতে চাষাবাদ শুরু করারও অভিযোগ করেছেন জমির ওয়ারিশরা।

‎অভিযোগ রয়েছে, হেডম্যানের দায়িত্ব ও ক্ষমতার প্রভাব কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগদখলীয় জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন শৈচিং থুই মারমা। এ ঘটনায় নিজেদের পৈতৃক ও দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় জমি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

‎স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমি-সংক্রান্ত বিরোধে ভিন্ন ভিন্ন তথ্যসংবলিত জবানবন্দি ও কাগজপত্র উপস্থাপন করে প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি এলাকাবাসীর মধ্যে বিভেদ ও অবিশ্বাস তৈরি করে বিরোধকে আরও জটিল করে তোলার অভিযোগও রয়েছে। হেডম্যানের পদ-পদবি ও সামাজিক প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

‎সংশ্লিষ্ট দুটি জবানবন্দির কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৩৫৩ নং কোলাদি মৌজার ২৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে পাঁচ একর তৃতীয় শ্রেণির পাহাড়ি জমির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে জমির মালিক হিসেবে মংসিংগ্য মারমার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জমিটির চৌহদ্দিতে উত্তরে শীল পাহাড়, দক্ষিণে দাব্রো ক্ষ্যং ঝিরি, পূর্বে পাহাড় এবং পশ্চিমে শঙ্খ নদী দেখানো হয়েছে।

‎অন্যদিকে, হেডম্যানের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত আরেকটি জবানবন্দিতে একই মৌজার তৃতীয় শ্রেণির এক একর পাহাড়ি জমির বিবরণ পাওয়া গেছে। সেখানে মালিক হিসেবে আগাওয়াইং ছা ভিক্ষুর নাম উল্লেখ রয়েছে। ওই জমির চৌহদ্দিতে উত্তরে পলিকা ঝিরি, দক্ষিণে পাহাড়, পূর্বে প্রুথোয়াই অং এবং পশ্চিমে পাহাড় উল্লেখ করা হয়েছে।

‎দুটি কাগজে জমির পরিমাণ, মালিকানা ও চৌহদ্দির বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে, সাঙ্গু নদীতে জেগে ওঠা চরটির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে দাবি করেছেন ওয়ারিশ পিপলু মারমা। তাঁর অভিযোগ, বিহারের জমির কাগজপত্র ও চৌহদ্দির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ জমিটির কোনো মিল না থাকলেও হেডম্যান সেটি দখলের চেষ্টা করছেন।

‎সরেজমিনে দেখা গেছে, বিরোধপূর্ণ জমিতে সাঙ্গু নদীর জেগে ওঠা চরকে খাসজমি দাবি করে কয়েকজন নারী বীজ বপন করছেন। গ্রামের ১১ জন নারী দলবদ্ধভাবে সেখানে কৃষিকাজ শুরু করেছেন। তবে তাঁদের অনেকেই জমিটির প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন। বিহারের এক ভিক্ষুর কথায় তাঁরা সেখানে কাজ করতে এসেছেন বলে দাবি করেন।

‎এ বিষয়ে স্থানীয় নারী সিংনুপ্রু বলেন, “জায়গাটি কার, তা আমরা জানি না। রাতে বিহার থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ভোরে জমিতে বীজ বপন করতে হবে। তাই ভিক্ষুর কথায় বীজ বপন করতে এসেছি। মূল ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।

‎পলিকা বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রিয় ভিক্ষু বলেন, জমিতে চাষাবাদ বা বীজ বপনের জন্য আমি কোনো নির্দেশনা দিইনি। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তবে দখল না করে পাড়াবাসী জমির মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করতে পারতেন। হেডম্যান চাইলে এত বড় ঘটনা না ঘটিয়েও বিষয়টি সমাধান করতে পারতেন।”

‎পলিকা পাড়া বৌদ্ধ বিহারের সভাপতি উবামং মারমা বলেন, “আমি আগে বিহারের কমিটিতে ছিলাম না। জমিটি দখলের জন্য হেডম্যান আমাকে দুই দিনের জন্য সভাপতি বানান। এরপর আমাকে বাদী করে হেডম্যান নিজেই অভিযোগ দায়ের করেন। আমাকে স্বাক্ষর দিতে বলেছেন, তাই দিয়েছি। আমি অশিক্ষিত, কাগজে কী লেখা আছে তা পড়তে পারি না।”

‎পলিকা পাড়ার গ্রামপ্রধান দুংখি অং মারমা বলেন, “হেডম্যান নিজেই একটি কাগজ লিখে আমাকে দিয়েছেন। সভাপতি না থাকায় আমি তাঁর পক্ষে স্বাক্ষর করেছি। আর জমিটি খাস নাকি ব্যক্তিমালিকানাধীন, সেটি হেডম্যানই বলতে পারবেন।

‎ভুক্তভোগী পিপলু মারমা বলেন, “আমার বাবা জীবিত থাকাকালে বিভিন্ন জায়গায় জমি দান করেছেন। কিন্তু এই জমির চৌহদ্দির সঙ্গে দখলের পক্ষে যে কাগজ দেখানো হচ্ছে, তার কোনো মিল নেই। বাবা জীবিত থাকাকালে কেউ এই জমির মালিকানা দাবি করেননি। অথচ বাবার মৃত্যুর মাত্র দুই মাসের মধ্যে হেডম্যান নিজেই জমি দখলে নামেন। এ কাজে গ্রামবাসীদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

‎তিনি আরও বলেন, “কখনো জমিটি অন্যের, কখনো খাস, আবার কখনো গ্রামবাসীর দাবি করা বিহারের জমি বলে প্রচার করা হচ্ছে। এভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে আমার জমি দখল করা হয়েছে। এমনকি জমিতে বর্গাচাষ করা কৃষককেও হয়রানি করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।”

‎অভিযোগের বিষয়ে ৩৫৩ নম্বর কোলাদি মৌজার হেডম্যান শৈচিং থুই মারমা বলেন, “তাঁদের জমির চৌহদ্দি আলাদা, ভিক্ষুর জমির চৌহদ্দিও আলাদা। তবে নদীতে যে চর জেগেছে, সেটি খাসজমি। এ কারণে পাড়াবাসীর সম্মতিতে বিহারের নামে জায়গাটি দখলে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে জায়গাটি বিহারের কাছে দান করা হবে এবং সেখানে ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।”

‎জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, “এখানে কারও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করা হয়নি। তাঁদের জমির সীমানা নদী পর্যন্ত। নদীতে জেগে ওঠা চরটি খাসজমি বলেই আমরা মনে করছি। এ কারণে পাড়াবাসীর একটি কমিটি গঠন করে জায়গাটি দখলে নেওয়া হয়েছে।”

‎অভিযোগের বিষয় রুমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমজাদ হোসেন বলেন, পাঁচটি জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে কোলাদি মৌজার হেডম্যানের বিরুদ্ধে এক শিক্ষক অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে আমরা এগোচ্ছি।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাজধানীতে আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলার উদ্বোধন করলেন এমপি দীপেন দেওয়ান

১

বান্দরবান পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

২

ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে সনদ পেলেন সাংবাদিক এম এইচ সোহেল

৩

রুমায় কোলাদি মৌজার হেডম্যানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ‎

৪

নাইক্ষ্যংছড়িতে পুলিশের অভিযানে ৩০ হাজার ইয়াবা ও বিদেশি পিস্তল উদ্ধার, আটক-১

৫

নাইক্ষ্যংছড়িতে আগুনে পুড়ে ছাই দোকান ও বসতঘর

৬

রুমার দূর্গম পাড়ার জনগণের যাতায়াত সমস্যা নিরসন করলো সেনাবাহিনী

৭

নাইক্ষ্যংছড়িতে মাদক কারবারের ৬ লাখ টাকাসহ তিনজন গ্রেফতার

৮

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের হিসাব-সহকারীর কমিশন বাণিজ্য

৯

আগামী ৬ নভেম্বর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুইদিন ব্যাপি ৫ম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা

১০

হেমা চাকমার ‘আদিবাসী’ ও ‘স্বায়ত্তশাসন’ দাবির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ

১১

রুমা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট চরমে, ১১ পদ শূন্যে ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম

১২

এনসিপির ক্রীড়া সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক বান্দরবানের আরমানুল ইসলাম নয়ন

১৩

বান্দরবানের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইমতিয়াজের এইচএসসিতে সাফল্য

১৪

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন বান্দরবানের লিলিপ্রু মার্মা

১৫

রোয়াংছড়িতে তালুকদার পাড়া বৌদ্ধ বিহারের সীমাঘর নির্মাণের শুভ উদ্বোধন

১৬

বান্দরবানে জাতীয় বাজেটে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা অন্তর্ভুক্তির আহ্বান

১৭

দীর্ঘ সময় ইটভাটা বন্ধ, থমকে আছে বান্দরবানের উন্নয়ন

১৮

স্কুলের নির্মাণসামগ্রী বিক্রি করে শিক্ষকদের রাঙ্গামাটি ভ্রমণ

১৯

থানচির গর্বিত সন্তান সাধুমনি ফ্রান্সিস ত্রিপুরার যাজক অভিষেক ৬ নভেম্বর

২০
error: Content is protected !!