বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বান্দরবান জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মাম্যাচিং মারমা। দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর পর তিনি আবারও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ফিরলেন।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিষদ-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাম্যাচিং মারমাকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করা হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী,চেয়ারম্যান মাম্যাচিং মারমার সঙ্গে আরও ১৪ জনকে পরিষদের সদস্য করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর গঠিত আগের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ বাতিল করা হয়েছে। নতুন আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং নবগঠিত পরিষদই বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা,মাম্যাচিং মারমা বান্দরবানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। একাধিক মেয়াদে বান্দরবান জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতেও উপজাতি বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি মারমা সম্প্রদায়ের নারীদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী নারীদের অন্যতম হিসেবেও পরিচিত। রাজনীতিতে তার দীর্ঘ সম্পৃক্ততার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারীদের জাতীয় ও মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা রয়েছে বলে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
দুইবার সংসদ সদস্য,মাম্যাচিং মারমা বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসন থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ এবং ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে তিনি সরাসরি সাধারণ আসনেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০১ সালের অষ্টম ও ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান-৩০০ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
মাম্যাচিং মারমার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর এবার আবারও একই পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ফিরলেন তিনি। ফলে নতুন দায়িত্বে তার পূর্বের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের অনেকে।
পার্বত্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,সামনে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সামনে রয়েছে নানা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন,কৃষি ও পর্যটন, স্থানীয় অবকাঠামো,ভূমি-সংক্রান্ত বিষয় এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে পরিষদকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে বান্দরবানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও আস্থা বজায় রাখা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও নতুন পরিষদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে দায়িত্বে ফেরা মাম্যাচিং মারমার সামনে তাই পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করা,উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় ও আস্থা বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
মাম্যাচিং মারমাকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার খবর প্রকাশের পর বান্দরবানের রাজনৈতিক,সামাজিক ও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ,তিনি একই সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা,সাবেক সংসদ সদস্য এবং এর আগে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পূর্বের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নতুন পরিষদের কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব ফেলে,সেদিকেও নজর থাকবে স্থানীয় মহলের।
উল্লেখ্য, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের ইতিহাসে ১৯৮৯ সালে প্রথম প্রত্যক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে আর কোনো প্রত্যক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। আইন সংশোধনের মাধ্যমে পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
নতুন পরিষদের মেয়াদে স্থানীয় উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে চেয়ারম্যান মাম্যাচিং মারমার নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হয়এখন সেটিই দেখার বিষয়।
আরো পড়ুন→নবগঠিত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে যারা আছেন
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন