প্রকৃতির অকৃপণ সৌন্দর্যের কোলে যাদের বসবাস, জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তারাই যেন সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। সমতল কিংবা দুর্গম পাহাড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন কাটে অভাব, অবহেলা আর নিরবচ্ছিন্ন বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। সভ্যতার চোখধাঁধানো অগ্রগতি, তথ্যপ্রযুক্তির সুবাতাস কিংবা উন্নয়নের বড় বড় মহাপরিকল্পনা আজও পূর্ণাঙ্গভাবে পৌঁছুতে পারেনি তাঁদের মাটির তৈরি কিংবা বাঁশ-ছনের কুঁড়েঘরে।
আদিবাসী পাড়া গুলোতে আজও অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো অধরা। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শিশুরা ভৌগোলিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তকের অভাব এবং নিজ ভাষার বিদ্যালয় না থাকায় ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনক। অনেক ক্ষেত্রে মাইলের পর মাইল ঝিরিপথ ও পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া কোমলমতি শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
রোগ-শোকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের একমাত্র ভরসা ঝাড়ফুঁক কিংবা স্থানীয় কবিরাজি চিকিৎসা। উপজেলা বা জেলা সদরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই কেবল সঠিক যোগাযোগের অভাবে অনেক মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ ঝরে যায়। বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির চরম সংকট, পুষ্টিহীনতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। মহাজনদের চড়া সুদের ঋণ আর ন্যায্য মূল্য না পাওয়া কৃষিজ পণ্যের কারণে অভাবের ঘূর্ণাবর্ত থেকে কিছুতেই বের হতে পারছেন না তাঁরা।
আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং শতাব্দী প্রাচীন রীতিনীতি আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠোপোষকতার অভাবে অনেক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাতৃভাষা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। প্রবীণদের মৃত্যুর সাথে সাথেই যেন মুছে যাচ্ছে একটি করে ভাষার শেষ স্মৃতিচিহ্ন।
স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন। কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠী আজও নিজেদের ভূমি রক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের নেওয়া নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প সত্ত্বেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে তদারকির অভাবে তাঁদের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে ধীরগতিতে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার অংশ হিসেবে না দেখে, তাঁদের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও জীবনমানকে মূলধারার জাতীয় উন্নয়নের সাথে জোরালোভাবে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। বঞ্চনার ইতিহাস মুছে দিয়ে তাঁদের জন্য সুশিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থায়ী অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়।
আরো পড়ুন→কাপ্তাইয় সুইডেন পলিটেকনিক্যালে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১২ শিক্ষার্থী আহত
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন