নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ৭:১১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৬৩৮ জন

দরিদ্র শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ফেলে বাড়িতে সময় কাটান শিক্ষকরা

Copy Link

রুমা প্রতিনিধিঃ খুব বেশি ফাকি দেওয়া হয়েছে বলে মনে হলে পালা করে বিদ্যালয়ে যান দৈনিক একজন করে । বেশিরভাগ সময়ই উপস্থিত থাকেন না কোনো শিক্ষক। তখন বন্ধ থাকে বিদ্যালয়। পাঠ্যদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়,দরিদ্র এবং সুবিধা বঞ্চিত পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে এমন শিক্ষা ব্যবস্তার।এ অবস্থায় গত এক যুগের বেশি সময় ধরে এ বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেনি কোন শিশু,বেশির ভাগ শিশুই ঝড়ে পড়ছে শিক্ষকদের অবহেলায়। যারা কোনরকম উত্তীর্ণ  হতে পারলেও উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের অবস্থা নাজেহাল।

বান্দরবানের রুমা সদর ইউনিয়নের হমক্রী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্র এটি। সদর থেকে পূর্ব দিকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরে বিদ্যালয়টির অবস্থান। শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ইউএনডিপি স্কুল নামে পরিচিত বান্দরবানের রুমায় ২৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০১৭ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি জাতীয়করণের ঘোষনা করে সরকার। তার মধ্যে রুমা সদর ইউনিয়নের হুমক্রী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও একটি। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে আরো দুইজন শিক্ষকের পদায়ন হলে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট পাঁচজন।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি সিংওয়াই ম্রো বলেছেন শিক্ষিকাসহ দুইজন শিক্ষক বান্দরবান থেকে এসেছেন। জানুয়ারি মাস থেকে সেখানে বদলী এসে প্রথম দিকে দুই একদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। তারপর হতে তাদের আর কোনো হদিস নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বান্দরবান জেলা সদর থেকে আসা এই দুই শিক্ষকের নাম হ্লানুচিং খেয়াং ও অংক্যজাই খেয়াং। গত বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় রুমা বাজারে পাহাড় কণ্ঠের রুমা প্রতিনিধি কথা বলেন শিক্ষক অংক্যজাই খেয়াং এর সঙ্গে। ‌ তিনি বলেছেন, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর জানুয়ারি মাসে হুমক্রী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার সাথে হ্লানুচিং খেয়াংও যোগদান করেন। তবে তারা কর্মস্থলে যেতে পারেন না তাই তারা চারজন শিক্ষক মিলে বর্গা (ভাড়া) শিক্ষক রেখেছেন। মুঠোফোনে কল করা হলে বান্দরবান সদরে তার অবস্থান জানিয়ে শিক্ষক হ্লানুচিং খেয়াং বলেন, তিনি নিয়মিত পাঠদান করেন। বৃহস্পতিবার (১২সেপ্টেম্বর) সকালে বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন কিন্তু নদীতে পানি বেশি থাকায় যেতে পারেননি তাই বান্দরবান চলে এসেছেন বলে জানালেন শিক্ষক হ্লানুচিং খেয়াং। তবে স্কুল কমিটির সাবেক সভাপতি সিংওয়াই ম্রো বলেন, রুমা বাজার হতে স্কুলে আসতে কোনো নদী পাড় হতে হয়না। তার ভাষ্যমতে, পাড়ার শিশুদের কথা বিবেচনা করে শিক্ষক হ্লানুচিং খেয়াংকে শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) মোবাইলে কল করে বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসতে অনুরোধ জানানো হয়। ওইসময় বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা না বলে শিক্ষক হ্লানুচিং খেয়াং সব শিক্ষক মিলে মাসে ১০ হাজার টাকায় বর্গা শিক্ষক রাখার কথা জানিয়েছেন বলে জানালেন সিংওয়াই ম্রো। তিনি বলেন বিদ্যালয়ে নিয়মিত না আসায় শিক্ষক হ্লানুচিং খেয়াংকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা কেও চিনেন না।

রিংতুই পাড়ার বাসিন্দা বর্গা শিক্ষক মেনপ্রে ম্রো (২৩) বলেছেন, তাদের পাড়ার বিদ্যালয়ে নিয়োজিত লালরামলিয়ান বম, মংসাথোয়াই মারমা, হ্লানুচিং খেয়াং ও অংক্যজাই খেয়াং এই চার শিক্ষক মিলে তাকে (মেনপ্রে ম্রো) এবং পায়া ম্রোকে বর্গা শিক্ষক হিসেবে রাখা হয়েছে। তারা দুইজন মাসে সাত হাজার টাকায় বর্গা শিক্ষক হিসেবে পড়িয়ে যাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের। চারজন সরকারি শিক্ষক প্রতিজনের কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে মাসে ১৪ হাজার টাকা করে গত মার্চ মাস থেকে জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত এই দুই বর্গা শিক্ষকের পারিশ্রমিক হিসেবে টাকা প্রদান করেছেন উক্ত শিক্ষকগণ। তবে আগস্ট মাস থেকে তারা দুইজন আর বর্গা শিক্ষকের কাজ করছেন না বলে জানিয়েছেন মেনপ্রে ম্রো।

শিক্ষকদের এহেন দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অমানবিক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা। শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষকদের এমন সীমাহীন অনিয়মের কারণে দুর্গম এলাকার সুবিধাবঞ্চিত বেশিরভাগ শিশুরা পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে পারছে না, ফলে ঝড়ে পড়ার হার কমার পরিবর্তে বেড়েই চলেছে। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের মাসে মাসে বেতন দিয়ে রাষ্ট্রের তথা জনগণের টাকা খরচ করে শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত হলে এ দায়ভার নিবে কে?

এদিকে রুমা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস পরিণত হয়েছে অনিয়মের আখড়ায়। বর্তমানে শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন আশীষ চিরান। তবে অসংখ্যবার শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেয়া হলেও কোন অনিয়মের সুষ্ঠু সুরাহা করেননি তিনি। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবার একই উত্তর দিয়ে থাকেন, “অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে”। শিক্ষা কর্মকর্তার এমন কর্মকান্ডে সন্দেহ দেখা দিয়েছে জনমনে, ফলে শিক্ষকরা হয়ে উঠছেন আরো লাগামহীন, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দরিদ্র শিশুরা।

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তে ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকার ইয়াবা উদ্ধার

১

পার্বত্য তিন কমিটি বাতিলের দাবিতে নাগরিক সমাবেশের ডাক দিয়েছে পিসিসিবিএ

২

সম্প্রীতির বান্দরবান ফুটবল টুর্নামেন্টে সদর উপজেলার শিরোপা জয়

৩

জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসায় শায়খ জয়নুল আবেদীন আল-কাদেরীকে সম্মাননা

৪

নতুন দায়িত্ব পেলেন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

৫

সাজেকে ইউপিডিএফ-জেএসএস সংঘাতে শিশু গুলিবিদ্ধের ঘটনায় পিসিসিপির নিন্দা

৬

দেশজুড়ে দখল-চাঁদাবাজি ও হামলা নিয়ে ৩৮ নাগরিকের উদ্বেগ

৭

রুমায় পানির সংকট নিরসনে সেনাবাহিনী কর্তৃক ১ লক্ষ লিটারের ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণ

৮

বিলাইছড়িতে বিজিবির ওপর হামলার অভিযোগ, পিসিসিপির নিন্দা

৯

আবারো বান্দরবানে ফিরেছেন ওষুধ সাপ্লাই কাণ্ডে বিতর্কিত সিভিল সার্জন

১০

আবারো বান্দরবানে ফিরেছেন ওষুধ সাপ্লাই কাণ্ডে বিতর্কিত সিভিল সার্জন

১১

নাইক্ষ্যংছড়িতে বসতবাড়ি থেকে ১০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার, মালিক পলাতক

১২

নাইক্ষ্যংছড়িতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী-সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত

১৩

আলীকদমে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও সাংবাদিক হয়রানির অভিযোগ

১৪

বান্দরবানে এনসিপি নেতা মিজানুর রহমান আখন্দের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি

১৫

৪৫ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই পিডি নজরুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গায় বদলি

১৬

নাইক্ষ্যংছড়িতে মসজিদের শৌচাগারে পাওয়া গেলো ব্যবসায়ীর মরদেহ

১৭

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিন কমিটি বাতিলসহ ৪ দফা দাবি জেএসএসের

১৮

লামায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দিনমজুরের লাশ উদ্ধার

১৯

গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা গেলো ধর্মপুর একাদশের ঘরে

২০
error: Content is protected !!