প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে কর্মরত মাত্র তিন শিক্ষক, নিয়মিত পাঠদান না হওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় শিক্ষার্থীরা
বান্দরবানের রুমা উপজেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রুমা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। শিক্ষক ও কর্মচারী মিলিয়ে মোট ১১টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়নরত প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত মাত্র তিনজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং অন্য দুজন সহকারী শিক্ষক। অথচ প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ বিভিন্ন বিষয়ের মোট আটটি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, অফিস সহায়ক ও নৈশপ্রহরী পদেও কোনো জনবল নেই। ফলে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
বিদ্যালয়ে ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, কৃষিশিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা, ধর্মসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষক সংকটের কারণে পালাক্রমে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত পাঠ সময়মতো শেষ করতে পারছে না। বিশেষ করে কঠিন ও বিষয়ভিত্তিক পাঠ বুঝতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থাকলেও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ করা এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রতিদিন নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও সব বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় অনেক সময় ক্লাস করা সম্ভব হয় না। নিজেরা পড়াশোনার চেষ্টা করলেও জটিল বিষয়গুলো বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষকের সহযোগিতা না পাওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসার পরও সব বিষয়ে ক্লাস করার সুযোগ হয় না। কোনো বিষয়ে বুঝতে সমস্যা হলে তা সমাধান করে দেওয়ার মতো শিক্ষক পাওয়া যায় না। এতে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে।
নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, শিক্ষক না থাকায় অনেক বিষয় নিজেরাই পড়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে। কিন্তু গণিত ও ইংরেজির মতো বিষয়ে শিক্ষকের নির্দেশনা ছাড়া ভালোভাবে শেখা কঠিন। নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেসিংউ মার্মা বলেন, “আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা রয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে কোন বিষয়ের কতটুকু পড়া শেষ হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। আমরা চাই, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদানের ব্যবস্থা করা হোক।”
২ নম্বর সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মংমিন মার্মা বলেন, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য রুমা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে দীর্ঘদিন শিক্ষক সংকট অব্যাহত থাকলে এলাকার শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং দূরবর্তী পাড়ার শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া অনেক কঠিন।
তিনি আরও বলেন, প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র তিনজন। তাঁদের মধ্যে একজন বিএড প্রশিক্ষণে থাকায় বাস্তবে বিদ্যালয়ের পাঠদান পরিচালনায় আরও বেশি সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে এত শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিখিল কান্তি দেব বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পালাক্রমে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের হতাশ ও নিরাশ হতে দেখে তাঁরও খারাপ লাগে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলো, ইংরেজি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় পাঠদান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কারণে প্রায় ১১টি পদ শূন্য রয়েছে। তবে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে বলে তিনি শুনেছেন। নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেগুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের দাবি, শুধু পরীক্ষা নেওয়া নয়, শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে প্রতিটি বিষয়ে দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা জরুরি। তাই বিদ্যালয়ের শূন্য শিক্ষক পদগুলো দ্রুত পূরণ করে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, অফিস সহায়ক ও নৈশপ্রহরী পদে জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, রুমা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের শূন্য পদ পূরণে শিক্ষা বিভাগ দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। অন্যথায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ মেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন