বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ে বছরের পর বছর শিকলে বন্দি থেকে ভারী গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে হাতি। সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এমন আটটি হাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাহাদুর নামের একটি হাতি ২৪ বছরের বেশি সময় ধরে গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তার মাহুত। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন থেকে গাছ পরিবহনের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় এসব হাতিকে শিকলে বেঁধে রাখা হচ্ছে।
বান্দরবানের লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ে ভারী গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে আটটি হাতি। পাহাড়ের দুর্গম পথ দিয়ে গাছ টানার পর এসব হাতিকে শিকলে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব হাতির সন্ধান পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লামা সদর ইউনিয়নের ঘিলাপাড়ায় একটি, দোছড়ি এলাকায় দুটি, চিউনী খালের আগায় একটি, রূপসীপাড়া ইউনিয়নের লামা খালের আগায় দুটি এবং সরই ইউনিয়নের লেমুপালং ও লুলাইং এলাকায় দুটি হাতি রয়েছে। এসব হাতি দিয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে ভারী গাছ টেনে নেওয়ার কাজ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সদর ইউনিয়নের ঘিলাপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বাহাদুর নামের একটি হাতির পায়ে শিকল বাঁধা। হাতিটির বয়স প্রায় ৩৮ বছর। মাহুতের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৪ বছরের বেশি সময় ধরে গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বাহাদুর। কাজের সময় পাহাড়ের দুর্গম পথ দিয়ে ভারী গাছ টেনে নিয়ে যেতে হয় তাকে। কাজ শেষে আবারও শিকলে বেঁধে রাখা হয়।
সারাদিন কাজ করার পর খাবারের জন্য হাতিটিকে কিছু সময় ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় আশপাশের লতাপাতা খেয়ে সময় কাটায় বাহাদুর। মাহুতের কাছ থেকে জানা যায়, গাছ টানার কাজে প্রতিদিন ছয় হাজার টাকা ভাড়ায় হাতিটিকে দেওয়া হয়। একেক দিন একেক এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।বাহাদুরের মাহুত সিফার বলেন, হাতিটির মালিকের বাড়ি সিলেটে। লামা উপজেলায় গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হাতিগুলো সিলেট বন বিভাগের অধীনে লাইসেন্স করা। তবে বাহাদুর কীভাবে লামায় এসেছে, তা তিনি জানেন না। এ বিষয়ে মালিক বলতে পারবেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু বাহাদুর নয়, লামার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় আরও সাতটি হাতি দিয়ে গাছ টানানোর কাজ করা হচ্ছে। এসব হাতিকে দীর্ঘ সময় শিকলে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
সদর ইউনিয়নের পোপা হেডম্যান পাড়ার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বড় গাছ টানতে গিয়ে মাঝেমধ্যে হাতি দুর্ঘটনার শিকার হয়। গত বছর তাঁদের পাড়ার কিছুটা ওপরের দিকে একটি হাতি পাহাড় থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছিল। পরে চিকিৎসা না পেয়ে কয়েক দিন পর হাতিটি মারা যায় বলে দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লামার বনাঞ্চল থেকে শত শত মাতৃবৃক্ষ ও বনজ ঔষধি গাছ কেটে এসব হাতির মাধ্যমে টেনে বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়েছে। পরে গাছগুলো লামা পৌরসভা, লামা ইউনিয়ন ও সরই ইউনিয়নের বিভিন্ন ডিপোতে নেওয়া হয়।গাছ পরিবহনের সুবিধার্থে পাহাড় কেটে এবং ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ করে ৩০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা তৈরির অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, বন থেকে গাছ কাটা ও পরিবহনের এই প্রক্রিয়ায় বনাঞ্চল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বন থেকে গাছ কেটে হাতির মাধ্যমে পরিবহনের এই ব্যবস্থায় একদিকে বন উজাড়ের অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে হাতিগুলোকে ভারী শ্রমে নিয়োজিত রাখার বিষয়টিও সামনে এসেছে। হাতিগুলোর পরিচর্যা, চিকিৎসা এবং শ্রমে ব্যবহারের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফজুর রহমান বলেন, দুই বছর আগে লামা সদর ইউনিয়ন থেকে একটি হাতি ও তার মাহুতকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দিয়ে আদালতে তোলা হয়। পরে বন আদালতে নিয়মিত মামলা হলে হাতিটিকে চকরিয়ার ডুলহাজারা সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়।
মোস্তাফজুর রহমান আরও বলেন, যেসব এলাকায় হাতি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব স্থানে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।
স্থানীয়দের দাবি, বনাঞ্চল থেকে গাছ কাটা ও পরিবহনের কাজে হাতির ব্যবহার এবং হাতিগুলোর জীবনযাপনের পরিস্থিতি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে হাতিগুলোর লাইসেন্সের বৈধতা, পরিচর্যা ও চিকিৎসার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
No tags found for this post.
মন্তব্য করুন