নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ মে ২০২৬, ১০:৩৭ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৫৩৬৫ জন

পাহাড় থেকে সমতল—উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণ, নেপথ্যে যে ৫টি বড় কারণ

Copy Link

বিশেষ প্রতিবেদনঃ দেশের সমতলের জেলাগুলোর পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলেও সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। নারী ও শিশু অধিকারকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়; বরং এটিএ আমাদের সামাজিক, আইনি এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থার এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের ফল। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের অপব্যবহার—সবকিছুই এই অপরাধকে উস্কে দিচ্ছে।

অনুসন্ধান ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে পাহাড় থেকে সমতলে ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে মূলত ৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

  • বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দীর্ঘসূত্রতা

অধিকাংশ অপরাধবিজ্ঞানী মনে করেন, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বেশি সাহসী করে তুলছে। দেশে একটি ধর্ষণ মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে প্রভাবশালী আসামিরা জামিনে বের হয়ে আসে কিংবা প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ ধর্ষণ মামলায় চূড়ান্ত রায়ে আসামির সাজা হওয়ার হার অত্যন্ত কম, যা অপরাধীদের মনে আইনভীতির বদলে এক ধরনের ঔদ্ধত্য তৈরি করছে।

  • ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রান্তিকতার সুযোগ

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণ কেবল একটি শারীরিক বা যৌন অপরাধ নয়, এটি মূলত ক্ষমতার দাপট ও আধিপত্য প্রকাশের একটি বিকৃত মাধ্যম। সমাজে নারী ও শিশুদের দুর্বল বা অধীনস্থ ভাবার প্রাচীন মানসিকতা এখনো প্রবল। এর সাথে যখন স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ার জোর যোগ হয়, তখন অপরাধীরা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে। বিশেষ করে পাহাড়ি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তার অভাবকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

  • ভিকটিম ব্লেমিং ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

আমাদের সমাজে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুকে যেভাবে দেখা হয়, তা পরোক্ষভাবে অপরাধীদেরই আড়াল করে। লোকলজ্জা, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া এবং একঘরে হওয়ার ভয়ে অনেক পরিবার মামলাই করতে চায় না। এর ওপর যোগ হয় ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা আক্রান্ত ব্যক্তিকে দোষারোপের সংস্কৃতি। অপরাধীর কঠোর শাস্তির দাবি তোলার বদলে অনেক সময় ভিকটিমের পোশাক, চলাফেরা বা বাইরে বের হওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যা মূল অপরাধের ভয়াবহতাকে আড়াল করে দেয়।

  • নৈতিক অবক্ষয়, পর্নোগ্রাফি ও মাদক

পারিবারিক শিক্ষার অভাব এবং নৈতিক মূল্যবোধের পতনকে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান যুগে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অবাধ ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে বিকৃত যৌন কনটেন্ট ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার ঘটেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এটি তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশের মনস্তত্ত্বে নারীর প্রতি সহিংস ও বিকৃত মানসিকতা তৈরি করছে। এর পাশাপাশি সমাজে মাদকের বিস্তার অপরাধপ্রবণতা এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতা বাড়াতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

  • আইনের সেকেলেই সংজ্ঞা ও সংস্কারের অভাব

আইনজীবীদের মতে, আমাদের প্রচলিত দণ্ডবিধির (Penal Code) ধর্ষণের সংজ্ঞাটি অনেক পুরনো। আধুনিক যুগে যৌন সহিংসতার যে বহুমাত্রিক রূপ বা ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করে যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর অনেক কিছুই এই প্রাচীন সংজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। ফলে আইনি মারপ্যাঁচে এবং প্রমাণের অভাবে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। অপরাধের দ্রুততম সময়ে বিচার (Fast-track trial) নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একই সাথে পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব পর্যায়ে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সম্মতির (Consent) গুরুত্ব শিক্ষা দেওয়া এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

আরো পড়ুন→নাইক্ষ্যংছড়িতে ভূমি সেবা মেলার সমাপনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মাদক নির্মূলে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে: চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি

মাদক মামলার আসামিদের জামিন নিয়ে এমপি দীপেন দেওয়ানের কঠোর বার্তা

রোয়াংছড়ির কৃতিসন্তান মাওসেতুং আজ জেলা পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন

ছাত্রদল, পরে বিএনপি থেকে বান্দরবান জেলা পরিষদ সদস্য জসিম উদ্দীন তুষার

নাইক্ষ্যংছড়িতে ২১৫ পিস ইয়াবা ও গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছ পুলিশ

সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য থেকে আবারও পরিষদে লুসাই মং

দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ, সরকার জনগণের সেবক: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

সদর উপজেলা বিএনপি নেতা চনু মং এখন বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বাঁশ কাটতে গিয়ে প্রাণ গেল সাইফুলের, দুই পা বিচ্ছিন্ন

রাঙ্গামাটি গোল্ড কাপ ফাইনালে লড়াই হবে চন্দ্রঘোনা বনাম রিজার্ভ বাজার

১০

বান্দরবান জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাম্যাচিং–কে গণসংবর্ধনা

১১

পার্বত্য জেলা পরিষদের অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার তদন্তের মাধ্যমে করা হবে: প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল

১২

জেলা পরিষদ গঠনে আমার মতামত নেওয়া হয়নি: এমপি দীপেন দেওয়ান

১৩

নাইক্ষ্যংছড়িতে ১০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার, পালাল চোরাকারবারি

১৪

দায়িত্ব শেষ, মানবিক পথচলা নয়, পাহাড়ের বুকে হাবীব আজমের মানবিক অধ্যায়

১৫

বান্দরবানে মোবাইল ব্যবহার নিয়ে দ্বন্দ্ব, দায়ের কোপে যুবকের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন

১৬

লামায় নদী-খাল-ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের মহোৎসব

১৭

রাজপরিবার থেকে মন্ত্রিসভায় সাচিং প্রু জেরী

১৮

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য হলেন জসিম উদ্দিন তুষার

১৯

রাজপথের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ফারুক আহমেদ সাব্বির

২০
error: Content is protected !!