babul khan
৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ৭:০৪ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
পাঠক সংখ্যা ৫০৫০ জন

বান্দরবানে পর্যটন সড়ক বেহাল, জনশূন্য পাহাড়ে সড়ক উন্নয়ন

Copy Link

প্রায় ৮ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন, পাহাড় কাটায় পরিবেশ ঝুঁকির অভিযোগ

বান্দরবান জেলার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র নীলাচল। কিন্তু সেখানে যাতায়াতের প্রধান সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের। অথচ ওই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কার না করে উন্নয়নের নামে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জনবসতিহীন একটি এলাকায় সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে—যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংস্কারের অভাবে বেহাল নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের প্রধান সড়ক

জানা যায়, জেলা সদরের যৌথ খামার এলাকা থেকে নীলাচল হয়ে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে খানাখন্দে ভরা। প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ও স্থানীয় মানুষ এই ভাঙাচোরা সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু ওই সড়কের সংস্কার না হয়ে উন্নয়নকাজ চলছে টাইগার পাড়া হয়ে রুপালি ঝর্ণা ও সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত একটি প্রায় জনবসতিহীন এলাকায়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকল্প, ব্যয় প্রায় ৮ কোটি টাকা

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বান্দরবান জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ‘যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর টেন্ডার আহ্বান করা হয়। প্রকল্প অনুযায়ী ৩ কিলোমিটার ২৭০ মিটার সড়ক উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৩২ হাজার ২৩৭ টাকা।

এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পান ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মিলন কোম্পানি। তার মালিকানাধীন ‘হিমু কনস্ট্রাকশন’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পের ঠিকাদার আ:লীগ নেতা মিলন

এদিকে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও কীভাবে এই নিষিদ্ধ সংগঠনের একজন ওয়ার্ড সভাপতির প্রতিষ্ঠান সরকারি কাজ পেল—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

টেন্ডারে এক সড়ক, নির্মাণ হচ্ছে অন্য সড়কে

সরেজমিনে গিয়ে প্রকল্পের নামের সড়ক নির্মাণ কাজের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় “যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন” কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় উন্নয়ন কাজ চলছে টাইগার পাড়া হতে সিনিয়র পাড়া/রূপালী ঝর্না এলাকায়। প্রশ্ন থেকে যায় জনবহুল এলাকায় প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে জনশূন্য এলাকায় বাস্তবায়নের পিছনে কারা দিচ্ছে শক্তি ও মদত?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ঠিকাদার বলেন, “প্রকল্পের চুক্তিপত্রে যৌথ খামার থেকে টাইগার পাড়া পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নের কথা থাকলেও বাস্তবে কাজ হচ্ছে ভিন্ন একটি এলাকায়। এটি টেন্ডারের শর্তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”

টাইগার পাড়ার বাসিন্দারা অজানা কারণে মুখ খুলতে না চাইলেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, “নীলাচল সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। হাজার হাজার মানুষ আর পর্যটক এই রাস্তা ব্যবহার করে। কিন্তু সেই সড়কে কাজ না করে বরাদ্দের টাকা ব্যবহার করা হচ্ছে জনবসতিহীন এলাকায়। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”

আরো এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “টাইগার পাড়া থেকে রুপালি ঝর্ণা পর্যন্ত সড়কজুড়ে কোনো গ্রাম, স্কুল বা অফিস নেই। সাধারণ মানুষ এই রাস্তা ব্যবহারই করে না। এতে আমাদের কোনো উপকার হবে না।”

রিসোর্ট ও বাগান মালিকদের সুবিধা দিতে সড়ক?

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সড়ক নির্মিত হলে মূলত উপকৃত হবেন কিছু প্রভাবশালী রিসোর্ট ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকরা। সরকারি অর্থে তাদের ব্যক্তিগত স্থাপনার সংযোগ সড়ক তৈরি হচ্ছে কিনা—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কাজ শেষ হলে আশপাশে কয়েকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন রিসোর্ট গড়ে উঠবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে রিসোর্ট নির্মাণের কাজ চলছে।

পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের অভিযোগ

সরেজমিনে দেখা গেছে, টাইগার পাড়া থেকে রুপালি ঝর্ণা ও সিনিয়র পাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকার সড়ক নির্মাণে পাহাড় কেটে এবং বনজ গাছ কেটে ভরাট করা হচ্ছে। সাইট ওয়ালের পাশ থেকেও পাহাড়ের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে, যা পরিবেশ ঝুঁকি তৈরি করছে।

পাহাড় কাটার বিষয়ে বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, “সড়ক নির্মাণে পাহাড় কাটার অভিযোগ পেয়েছি। দেড় বছরে এ ধরনের কোনো অনুমতির আবেদন আমাদের কাছে আসেনি। লিখিত অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা আইনত অপরাধ।”

উন্নয়নের নামে আবাদে কাটা হয়েছে পাহাড় উজাড় করা হয়েছে বন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে ধোঁয়াশা

এলজিইডির ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে এলজিইডির বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তাসাউর বলেন, “পার্বত্য এলাকায় আগে রাস্তা বানানো হয়, পরে জনবসতি গড়ে ওঠে। যে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে, তা টাইগার পাড়া হয়ে রুপালি ঝর্ণা ও রেইচা মেইন সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে, যা একটি বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করবে।”

তিনি আরও বলেন, “সড়কের পাশে কারো রিসোর্ট বা বাগান আছে কিনা, সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়। সড়কটি ২০১৩ সালেই এলজিইডির গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। নামকরণে ভুল হয়েছিল।”

অপরাধ ও পাচার ঝুঁকির আশঙ্কা

স্থানীয়দের আশঙ্কা, নতুন এই সড়কটি বান্দরবানের প্রবেশমুখে অবস্থিত রেইচা আর্মি ক্যাম্পের ৫০ মিটার সামনে গিয়ে যুক্ত হবে। এতে করে চেকপোস্ট এড়িয়ে মাদক, চোরাই সিগারেটসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচারের ঝুঁকি বাড়বে।

 স্থানীয়দের একটাই দাবি

স্থানীয়দের দাবি, আগে নীলাচল-টাইগার পাড়া এলাকার প্রধান সড়কটি জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা হোক। প্রকৃত জনস্বার্থের বাইরে এসে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ করা হোক।

আরো পড়ুন→বান্দরবানে পর্যটন সড়ক বেহাল, জনশূন্য পাহাড়ে সড়ক উন্নয়ন

Facebook Comments Box

No tags found for this post.

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আস্থার সংকটে চাপ বাড়ছে ইসলামী ব্যাংকে

২২০ ডিজিটের টোকেনে গ্রাহক ভোগান্তি:বিভ্রান্তি এড়াতে জেনে নিন আসল কারণ ও সমাধানের নিয়ম

ঢাকা সিলেট মহাসড়কে বাস উল্টে ৪ যাত্রী নিহত

বান্দরবানে বেপরোয়া পর্যটকদের দাপটে বাড়ছে দুর্ঘটনা, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয়রা

নাইক্ষ্যংছড়িতে ২০ হাজার ইয়াবাসহ বৃদ্ধা নারী আটক

শিক্ষকের উদ্যোগে দুর্গম সীমান্ত এলাকায় ফ্রি চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ 

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগে উদ্বেগ

নাইক্ষ্যংছড়ি বিজিবির অভিযানে প্রায় ৩ কোটি টাকার ইয়াবা জব্দ

বান্দরবানে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই ৮ বসতঘর, রক্ষা পায়নি কোনো মালামাল

নাইক্ষ্যংছড়িতে আশ্রিত ঘরে আগুন দিয়ে জমি দখলের পাঁয়তারা

১০

রুমায় জেলা পরিষদের সড়ক নির্মাণ কাজে অনিয়মের অভিযোগ

১১

বান্দরবানের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাবেক ফুটবলার নজরুল ইসলাম বাদশার মৃত্যুতে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং-এর গভীর শোক

১২

পাহাড়ের বুক জুড়ে কুয়াশার ছায়া

১৩

পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান

১৪

ফের বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম, বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়

১৫

রাঙ্গামাটিতে পর্যটকবাহী নৌকা ডুবে নিখোঁজ–১

১৬

বান্দরবানে নির্বাকসহ ৭ ব্যান্ডের পরিবেশনায় জমজমাট ‘ব্যান্ড উৎসব ২০২৬’

১৭

বিলীন সবুজ,রক্তাক্ত বুক

১৮

আজন্ম পাপের উপাখ্যান

১৯

রাঙ্গামাটিতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে সাফল্য অর্জন, ডিবি টিমকে অর্থ পুরস্কার প্রদান

২০
error: Content is protected !!