ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি এবং পাহাড়ের দুর্গম এলাকার ভোটার ও সমতলের আদিবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর–রুনি মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের আয়োজনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী।
মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন।
এছাড়া বক্তব্য রাখেন—আদিবাসী অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমিলা,লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান,এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
মূল বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ি অঞ্চলের আদিবাসীরা দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনুন্নত সড়ক ও নৌ যোগাযোগ, সামরিক উপস্থিতি এবং অস্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে বসবাস করছেন। এর ফলে তারা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে ক্রমাগতভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ভোটাধিকার প্রয়োগে ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা জাকির হোসেন আরও বলেন, দুর্গম এলাকায় বসবাসের কারণে অনেক আদিবাসী জনগণ জনগণনা ও জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে যান। ভোটকেন্দ্রের দূরত্ব, যাতায়াত সংকট এবং প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে বিশেষ করে কাপ্তাই হ্রদ তীরবর্তী অঞ্চলের নৌযাননির্ভর জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার প্রয়োগে নিরুৎসাহিত হন।
তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এসব বিশেষ বাস্তবতায় বসবাসকারী জনগণের জন্য নির্বাচনী যাতায়াত সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে আদিবাসী ভোটারদের অহেতুক তল্লাশি ও হয়রানি বন্ধের দাবিও জানান তিনি।
সমতলের আদিবাসীরাও সহিংসতা ও বঞ্চনার শিকার
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সমতলের বিভিন্ন অঞ্চলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে। জাতিগত পরিচয় ও ভূমি অধিকারের সংকটে তারা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় নির্বাচনকালীন সহিংসতা ও হয়রানির শিকার হন।
এ সময় সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নির্বাচনের আগে ও পরে আদিবাসী জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
আদিবাসী সমস্যা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখার আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, আদিবাসীদের সমস্যাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আরও উদ্যোগী ভূমিকা প্রত্যাশা করি।
তিনি বলেন, দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ভোট দিতে আসা আদিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
আঞ্চলিক দল নিবন্ধনে আইন সংস্কারের দাবি
লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ নেই, যা গণতন্ত্রের জন্য অন্তরায়। নির্বাচন নিবন্ধন আইনে সংস্কার এনে আঞ্চলিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, পাহাড়ের সমস্যা সমতলের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আদিবাসী নারীদের উদ্বেগ
আদিবাসী অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমিলা বলেন, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই আদিবাসীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আদিবাসী নারী ও শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার প্রসঙ্গ অনুপস্থিত
প্রশ্নোত্তর পর্বে অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দিক রয়েছে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে মানবাধিকারসহ এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজনৈতিক প্রচারণায় যথাযথভাবে উঠে আসছে না।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিসমূহ
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহ ও আগামীর সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়—
- অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি:
- দুর্গম পাহাড়ি ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্রের আশপাশে আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা
- ভোটকেন্দ্রগামী আদিবাসী ভোটারদের অবাধ যাতায়াত ও হয়রানি বন্ধ
রাজনৈতিক দল ও আগামী সরকারের প্রতি দাবি:
- সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন,পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্বের অবসান
- পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষমতায়ন
- ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা
- উন্নয়ন কর্মসূচিতে আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব
- সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও সংরক্ষিত আসন
সবশেষে প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে সংবাদ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।


