চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুরে আবারও মাথাচারা দিয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। এবার সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্পে অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে একদল সন্ত্রাসী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী তাৎক্ষণিক পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুললে মধ্যরাত পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

​গতকাল রবিবার (২৪ মে) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে পুরো এলাকা আচমকা ভারী অস্ত্রের গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে। এই ঘটনার পর থেকে পুরো জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকায় চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা

​স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, হামলার শুরুতেই সন্ত্রাসীরা ভারী বুলডোজার (স্কেভেটর) ব্যবহার করে যৌথবাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেয়। মূলত এলাকাটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি চিরতরে বন্ধ করতেই এই সুপরিকল্পিত ও দুঃসাহসিক হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নেপথ্যে 'ইয়াসিন বাহিনী', সড়ক কেটে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

​পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, জঙ্গল সলিমপুরের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হারানো স্থানীয় কুখ্যাত অপরাধী চক্র 'ইয়াসিন বাহিনী' এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। যৌথবাহিনীর ওপর হামলার পাশাপাশি যেন মূল শহর থেকে অতিরিক্ত ফোর্স সহজে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য সন্ত্রাসীরা জঙ্গল সলিমপুর থেকে আলীনগরে প্রবেশের মূল সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ কেটে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ:

হামলার পরপরই জঙ্গল সলিমপুরে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো এলাকা সিলগালা করে যৌথবাহিনী একটি বিশেষ চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

অপরাধের অভয়ারণ্য: জঙ্গল সলিমপুরের ইতিহাস

প্রায় ৩,১০০ একর আয়তনের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকাটি মূলত 'ছিন্নমূল' ও 'আলীনগর'—এই দুই ভাগে বিভক্ত। ভৌগোলিক দুর্গমতাকে কাজে লাগিয়ে গত চার দশক ধরে এখানে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ বসতি, বাজার ও নানা অবৈধ স্থাপনা। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলটি অস্ত্র তৈরি, মাদক চোরাচালান, খুন ও অপহরণের মতো জঘন্য অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

পূর্ববর্তী সহিংসতা ও শুদ্ধি অভিযান

​জঙ্গল সলিমপুরকে অপরাধমুক্ত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যার ফলে এর আগেও একাধিক রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে:

​১৯ জানুয়ারি (চলতি বছর): এখানে এক বিশেষ অভিযান চালাতে গিয়ে অপরাধীদের হামলায় নিহত হন র‍্যাবের ডিএডি মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া।

​৯ মার্চ (চলতি বছর): ডিএডি মোতালেব হত্যার পর এবং এলাকাকে অপরাধমুক্ত করতে প্রায় ৪,০০০ যৌথবাহিনীর সদস্য নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে এক বিশাল উচ্ছেদ ও শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়েছিল। সে সময় বহু অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মার্চের সেই বিশাল অভিযানের পর অপরাধী চক্র কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তবে গতকাল রাতের এই হামলা প্রমাণ করে যে,তারা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি,বরং পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।পাহাড়ের এই 'মিনি রাষ্ট্র' খ্যাত অপরাধ সাম্রাজ্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘমেয়াদী ও কঠোর স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন:ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বান্দরবানে মানববন্ধন