বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদ বুড়ির ঝিরি। চারপাশে পাহাড় আর আঁকাবাঁকা পথঘেরা এই এলাকা থেকেই জাতীয় অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাকে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তরুণ অ্যাথলেট মোশারফ হোসেন। ৮০০ ও ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়ে একের পর এক সাফল্য অর্জন করে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি ‘লামার উসাইন বোল্ট’ নামে।
জ্যামাইকান কিংবদন্তি দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের সঙ্গে রেকর্ড বা ক্রীড়াশৈলীর তুলনা নয়, বরং পাহাড়ি জনপদ থেকে উঠে আসা মোশারফের প্রতি স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা ও গর্ব থেকেই এই উপাধি।
মোশারফের বেড়ে ওঠা লামার বুড়ির ঝিরি এলাকায়। তিনি কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৮ সালে সেখানে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় এবং দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। নবম ও দশম শ্রেণিতে তাঁর বিভাগ ছিল ব্যবসায় শিক্ষা। স্কুলজীবন থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। সেই আগ্রহ থেকেই ধীরে ধীরে অ্যাথলেটিকসে যুক্ত হন এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা গড়ে তোলেন।
তবে মোশারফের পথচলা সব সময় সহজ ছিল না। জীবনের এক কঠিন সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর বাবা মো. শহিদুল্লাহ। মৃত্যুর আগে প্রায় ছয় মাস অসুস্থ ছিলেন তিনি। বাবাকে হারানোর শোক সামলে সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে মোশারফকে। তাঁর মা কুলসুমা বেগমও জীবনের এই কঠিন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বর্তমানে মোশারফ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অ্যাথলেটিকসে নিজের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন তিনি।
জাতীয় পর্যায়ে মোশারফের অর্জনের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ। ২০২৫ সালের ৪৮তম জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ৮০০ ও ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।
একই বছর অনুষ্ঠিত ১৭তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার, ১ হাজার ৫০০ মিটার ও ৪০০ মিটার রিলেতে প্রথম হন মোশারফ। এ প্রতিযোগিতায় তাঁকে সেরা অ্যাথলেট হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এরপর ৪৯তম জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়ে প্রথম এবং ৮০০ মিটারে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি ১৮তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ৮০০ ও ১ হাজার ৫০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব দেখান।
প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে এমন ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করায় মোশারফ এখন লামার তরুণদের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর এই অর্জন প্রমাণ করে, সুযোগ ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে প্রত্যন্ত জনপদ থেকেও জাতীয় পর্যায়ে নিজের পরিচিতি তৈরি করা সম্ভব।
তবে পাহাড়ি অঞ্চলে অনেক প্রতিভাবান তরুণ থাকলেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগের অভাবে অনেকেই নিজেদের প্রতিভা বিকাশ করতে পারেন না। এসব তরুণের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ক্রীড়াঙ্গনে আরও নতুন প্রতিভা উঠে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুড়ির ঝিরির পাহাড়ি পথ থেকে জাতীয় অ্যাথলেটিকসের ট্র্যাক—মোশারফ হোসেনের এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের সম্ভাবনারও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। স্থানীয় মানুষের দেওয়া ‘লামার উসাইন বোল্ট’ উপাধি নিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন নিজের লক্ষ্যপানে।