ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে হিজাব নিয়ে কথিত মন্তব্যের অভিযোগ এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপনের চেষ্টার প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ৩৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক। ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে সামাজিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে অভিযোগ করে তাঁরা উভয় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে নাগরিকেরা এসব দাবি জানান। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, গত ৭ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনীম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে কথিত মন্তব্যের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর শাস্তি দাবি এবং পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপনের চেষ্টার ঘটনাকে তাঁরা উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সুমি আক্তার গত ৭ অক্টোবর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থা ও পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন শিক্ষক তাসনীম সিরাজ মাহবুব। একপর্যায়ে নিকাব পরা এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ করে তিনি পর্দা ও পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় ওই শিক্ষার্থীসহ আরও দুজন ক্লাস থেকে বের হয়ে যান এবং পরে একটি ছাত্রসংগঠনের ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তবে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, এ বিষয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভিন্নমতও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া ব্যাখ্যায় তাসনীম সিরাজ মাহবুব দাবি করেন, তিনি কোনো শিক্ষার্থীকে পোশাক পরিবর্তন করতে, নিকাব খুলতে কিংবা ক্লাস ত্যাগ করতে নির্দেশ দেননি। শিক্ষার্থীর চোখ দেখতে না পাওয়ায় তাঁকে শনাক্ত করা ও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে অসুবিধার কথা জানিয়েছিলেন বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।
বিবৃতিদাতারা বলেন, পোশাকের স্বাধীনতা নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ। এ বিষয়ে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা বিতর্ক সৃষ্টি ছাড়া অন্য কিছু নয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত ৯ অক্টোবর ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর ব্যানারে কয়েকজন যুবক ও এক তরুণী ‘ভারতীয় আগ্রাসনের’ প্রতিবাদের নামে শিল্পকলা একাডেমির দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি লেপনের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ তাঁদের নিবৃত্ত করে।
এর আগে গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করার পর দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি আঁকা হয়। পরে ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এসব প্রতিকৃতি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বিবৃতিদাতারা এসব ঘটনাকে শিল্প-সংস্কৃতির ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
নাগরিকেরা বলেন, আপাতদৃষ্টিতে ঘটনা দুটি বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এর মধ্যে উদ্দেশ্যের অভিন্নতা লক্ষণীয়। একটি মহল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিকে পুঁজি করে ধর্মান্ধতাকে উসকে দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিতে পরিকল্পিতভাবে তৎপর বলে তাঁরা মনে করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে বলা কথাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ তুলে তাঁর শাস্তি দাবি করা যেমন আপত্তিকর, তেমনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতির অসম্মান করাও গভীর দুরভিসন্ধিমূলক। রবীন্দ্রনাথকে মুসলিমবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করার যে অপপ্রচার পাকিস্তানি শাসকেরা গত শতকের ষাটের দশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চালিয়েছিল, বর্তমানের এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে তারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করেন তাঁরা।
তাঁরা বলেন, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি মানুষের অবিভাজ্য সম্পদ। ধর্ম, ভৌগোলিক সীমানা কিংবা কোনো বিশেষ মতবাদের ভিত্তিতে এসব সম্পদ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আলাদা করে বিচার করা যায় না।
বিবৃতিতে উল্লিখিত দুটি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে নাগরিকেরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানান। একই সঙ্গে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন, দেশের অধিকার ও সংস্কৃতিসচেতন মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই বিভ্রান্ত হবেন না।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন: সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির, নারীপক্ষের সদস্য শিরীন পারভিন হক, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা, ড. গীতি আরা নাসরীন, ড. তানজীমউদ্দিন খান, ড. জোবাইদা নাসরীন ও রোবায়েত ফেরদৌস, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের ভিজিটিং অধ্যাপক ড. স্বপন আদনান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরদৌস আজিম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফারাহ তানজীম তিতিল, লেখক রেহনুমা আহমেদ, সাংবাদিক ও গবেষক সায়দিয়া গুলরুখ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী সাদাফ নুর, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির, কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস, কবি ও আদিবাসী সংস্কৃতিকর্মী মিঠুন রাকসাম, কবি ও আদিবাসীকর্মী হাফিজ রশিদ খান, মানবাধিকারকর্মী সাঈদ আহমেদ ও দীপায়ন খীসা, অধিকারকর্মী ড. হানা শামস আহমেদ এবং মুক্তাশ্রী চাকমা।
আরো পড়ুন→পার্বত্য চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিন কমিটি বাতিলের দাবিতে ঢাকায় গণসংযোগ