পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি পৃথক জাতীয় কমিটি বাতিলসহ আট দফা দাবিতে রাজধানীতে গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠন।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর পুরানা পল্টন মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে পল্টন মোড় থেকে বিজয়নগর হয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন নয়াপল্টন পর্যন্ত গণসংযোগ ও প্রচারপত্র বিতরণ করেন সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। এ সময় তাঁরা পথচারী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারপত্র বিলি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানান।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপক শীলের সঞ্চালনায় সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শান্তিদেবী তঞ্চংগা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (জাসদ)-এর সভাপতি গৌতম শীল, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

সমাবেশে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার অবসানের প্রত্যাশা থাকলেও বর্তমানে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগকে চুক্তির চেতনার পরিপন্থী উল্লেখ করে তিনি সরকারের এ ধরনের কার্যক্রমের নিন্দা জানান। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সমাবেশে সমাপনী বক্তব্যে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। অবিলম্বে চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক সব কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

কর্মসূচিতে বিতরণ করা প্রচারপত্রে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন ও পরিচালনা করা হচ্ছে না। চুক্তি লঙ্ঘন করে মন্ত্রণালয়ে অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের প্রতিবাদ জানানো হলেও তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়নি। বরং পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক কর্তৃত্ব শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

প্রচারপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তিনটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি গঠন করে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সভাপতি করে নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। প্রচারপত্রের দাবি অনুযায়ী, জাতীয় কমিটি ও নির্বাহী কমিটির সচিবালয়-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) পক্ষ থেকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রচারপত্রে বলা হয়, অতীতের সরকারগুলো সামরিক ও বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চল শাসনের চেষ্টা করেছে। এর ফলে ইতিবাচক পরিবর্তনের পরিবর্তে সংঘাত, রক্তপাত, বিভেদ ও বিদ্বেষ বেড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে ২০২৬ সালেও সামরিক ও বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চল পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা চুক্তির চেতনার পরিপন্থী বলে প্রচারপত্রে দাবি করা হয়।

এ প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি রাজনৈতিক উপায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আট দফা দাবি উত্থাপন করেছে সংগঠনগুলো।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি কমিটি অবিলম্বে বাতিল, চুক্তি অনুযায়ী বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন, মন্ত্রণালয় থেকে অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার, মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।

এ ছাড়া বিধিমালা প্রণয়নসহ দ্রুত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপ আয়োজন এবং পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যাসহ অন্যান্য সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারের উদ্যোগে বহুপক্ষীয় অর্থবহ সংলাপ শুরুর দাবি জানানো হয়।

আরো পড়ুন→আলীকদমে মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় প্রতিবেশীকে পিটিয়ে জখম, থানায় অভিযোগ