সুফল চাকমা

হেডম্যান-কারবারীরা কোনো সরকারের অংশ নন, আবার সব সরকারেরই অংশ। কারণ, প্রথাগত নেতৃত্ব হিসেবে তাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেন। পাশাপাশি তাঁরা সরকারি ভাতাও পেয়ে থাকেন। তাই হেডম্যান-কারবারীদের সরকারের অংশ বলা যায় বলে মন্তব্য করেছেন সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান।

রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে বান্দরবান হেডম্যান-কারবারী কল্যাণ পরিষদের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল—‘হেডম্যান-কারবারী একসঙ্গে চলি, প্রথা-রীতিনীতি সংরক্ষণে এক থাকি’।

অ্যাডভোকেট ভবতোষ দেওয়ান বলেন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, জেলা প্রশাসন ও সার্কেল চিফের কার্যক্রমে হেডম্যান-কারবারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও তাঁরা কাজ করেন। তাই প্রথাগত নেতৃত্বের এই দুই স্তরের প্রতিনিধিকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নারী হেডম্যান ও কারবারী নিয়োগ, নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। ভূমিসহ এলাকার বিভিন্ন বিষয়ে জনগণ, পাড়ার কারবারী ও মৌজার হেডম্যানদের সচেতন থাকতে হবে। স্থানীয় ভূমি বিরোধে হেডম্যান-কারবারীদের জড়িয়ে পড়া দুঃখজনক। এ ধরনের বিরোধসহ স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাঁদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

সম্মেলনে বক্তারা বলেন, প্রথাগত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংবিধানকে সমুন্নত রেখে নিজেদের অধিকার আদায়ে হেডম্যান-কারবারীদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।

সম্মেলনে হেডম্যান-কারবারীদের সরকারি ভাতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, পরিচয়পত্র, নারী নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন মৌজায় নারী হেডম্যান-কারবারীদের সঙ্গে বৈষম্যের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কিছু হেডম্যান-কারবারীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও আলোচনা হয়।

বক্তারা বলেন, সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার আগে হেডম্যান-কারবারীদের নিজেদের সুখ-দুঃখ ও সমস্যার কথা তুলে ধরা এবং সমাধানের পথ খোঁজার জন্য কার্যকর কোনো অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ছিল না। সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হেডম্যান-কারবারীদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান তাঁরা।

হেডম্যান-কারবারী কল্যাণ পরিষদের বিদায়ী সভাপতি হ্লাথোয়াই হ্রী মারমা হেডম্যানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা হেডম্যান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন মিনুপ্রু কারবারী, মংক্যচিং কারবারী, চম্পাট ম্রো হেডম্যান, রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুই শৈ থুই হেডম্যান, সাংবাদিক বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, রাজস্থলী উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, উথিন সিন হেডম্যান এবং নারী হেডম্যান সানু চিং মারমা।

বক্তারা জানান, বোমাং সার্কেলে ১০৯টি মৌজা ও প্রায় ১ হাজার ৫০০ পাড়ার কারবারী রয়েছেন। তিন পার্বত্য জেলায় পাড়ার কারবারীর সংখ্যা ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি। তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে বিচার, সালিশ ও বিরোধ মীমাংসাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।

সম্মেলনের শেষ পর্বে সর্বসম্মতিক্রমে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট হেডম্যান-কারবারী কল্যাণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। নতুন কমিটিতে উনিহ্লা মারমা হেডম্যানকে সভাপতি, মংনু মারমা হেডম্যানকে সাধারণ সম্পাদক, পারিং ম্রোকে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং হ্লামং হেডম্যানকে অর্থ ও দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।