আরাফাত খাঁনঃ দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা সংকট মোকাবিলায় নিজের ছুটির দিনেও ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে আয় করতেন প্রধান শিক্ষক বামংখিয়াং মিংলেন।

সেই সংগ্রামের গল্প গণমাধ্যমে উঠে আসার পর এবার জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই প্রধান শিক্ষক।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে গত সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের সাতজন শিক্ষকের তালিকায় স্থান পান বামংখিয়াং মিংলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার হাতে সম্মাননা তুলে দেন।

দুর্গম পাহাড়ঘেরা থানচির তিন্দু এলাকায় ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিয়মিত বেতন আদায় করা সম্ভব হয় না। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে সংকট তৈরি হয়।

এই সংকট মোকাবিলায় ছুটির দিনগুলোতে থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নৌপথে ইঞ্জিনচালিত বোট চালিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করতেন প্রধান শিক্ষক বামংখিয়াং মিংলেন। নৌকা চালিয়ে যে আয় হতো, তার বড় একটি অংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধে ব্যয় করতেন তিনি।

বামংখিয়াং মিংলেনের এই সংগ্রামের কথা চলতি বছরের ১৩ মে প্রথমে প্রতিদিনের বাংলাদেশ ও ঢাকা মেইল-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে। ‘শিক্ষকদের বেতন জোগাতে নৌকার মাঝি প্রধান শিক্ষক’—এমন শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হয়। এতে দুর্গম তিন্দুর শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র এবং একজন প্রধান শিক্ষকের অসাধারণ সংগ্রামের বিষয়টি দেশব্যাপী আলোচনায় আসে।

এরপর গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানান, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়া গেছে এবং বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামংখিয়াং মিংলেনের সংগ্রামের গল্প গণমাধ্যমে তুলে ধরার বিষয়ে সাংবাদিক সুফল চাকমা বলেন, দুর্গম তিন্দুর সেই শিক্ষক আজ জাতীয়ভাবে সম্মানিত হওয়াটা একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর জন্য আনন্দ ও গর্বের।তিনি বলেন, ‘দুর্গম এলাকার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়ে গত ১৩ মে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলাম। সেই প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষক বামংখিয়াং মিংলেনের অসাধারণ সংগ্রামের কথাও উঠে এসেছিল। তিনি সহকর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য ছুটির দিনেও ইঞ্জিনচালিত বোটে পর্যটক ও যাত্রী বহন করে আয় করতেন।’

সুফল চাকমা আরও বলেন, ‘একজন সাংবাদিক যখন দুর্গম এলাকার মানুষের কথা, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ নানা সংকট গণমাধ্যমে তুলে ধরেন, তখন সেটি শুধু একটি সংবাদ হয়ে থাকে না; কখনো কখনো সেই সংবাদ সংশ্লিষ্ট মানুষের অধিকার ও সম্ভাবনার কথাও রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরে। তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসা, নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং পরবর্তীতে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া—একজন সাংবাদিক হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে।’

সম্মাননা অনুষ্ঠানে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষকের প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়।

গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা পাওয়ায় বামংখিয়াং মিংলেনকে অভিনন্দন জানিয়ে সুফল চাকমা বলেন, ‘দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখার তাঁর এই নিরলস প্রচেষ্টা আরও অনেককে অনুপ্রাণিত করবে। শুভ হোক তিন্দুর শিক্ষা, এগিয়ে যাক পাহাড়ের শিশুরা।’