পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সরকারের গঠিত জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক—এই তিন উচ্চপর্যায়ের কমিটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)। সংগঠনটির দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে এসব কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং কমিটিগুলোর কাঠামো ও কার্যপরিধিতে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পিসিজেএসএস এসব কথা জানায়। একই সঙ্গে সরকারকে তিনটি কমিটি বাতিল করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি বিষয়ক অধিশাখার অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ গেজেটে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক তিনটি কমিটি গঠনের বিষয় প্রকাশ করা হয়।
এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ১৯ সদস্যের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে ১৫ সদস্যের নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে ৯ সদস্যের পরামর্শক কমিটি রয়েছে।
জাতীয় কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, আন্তঃসংস্থা বাস্তবায়ন তদারকি এবং জাতীয় কর্মকৌশল চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাহী কমিটির অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন, সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি এবং পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করে জাতীয় কমিটির কাছে উপস্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে গঠিত পরামর্শক কমিটির দায়িত্ব হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বিষয়ে নির্বাহী কমিটির কাছে সুপারিশ দেওয়া।
এই কমিটিকে আগামী দুই মাসের মধ্যে নির্বাহী কমিটির কাছে সুপারিশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের সদস্য রাখা হয়েছে।
পিসিজেএসএসের অভিযোগ, কমিটিগুলোর কাঠামো ও কার্যপরিধি বিশ্লেষণ করলে সেখানে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, জাতীয় ও নির্বাহী কমিটিতে সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি এবং নির্বাহী কমিটির সচিবালয়ে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স সংস্থার ভূমিকার কথা উল্লেখ থাকা সংগঠনটির কাছে উদ্বেগজনক।
পিসিজেএসএসের ভাষ্য, এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পরিবর্তে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।বিবৃতিতে নির্বাহী কমিটির কার্যপরিধিতে প্রচলিত আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির শর্ত ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন-সংস্কার এবং নতুন আইন ও বিধিবিধান প্রণয়নের সুপারিশের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পিসিজেএসএসের দাবি, চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত আইন সংশোধনের সুযোগ রাখা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি আরও জটিল ও অস্থিতিশীল হতে পারে। তবে এগুলো সংগঠনটির নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও দাবি—বিবৃতিতে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
পিসিজেএসএস আরও অভিযোগ করেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রান্তিক ভূমিকায় রাখা হয়েছে।বিবৃতিতে বলা হয়, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পরামর্শক কমিটিতে রাখা হলেও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পরিবর্তে তাঁর একজন প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া তিন সার্কেল চিফকেও এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে আঞ্চলিক পরিষদকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে কার্যকর করার পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিবৃতিতে বর্তমান সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে।
পিসিজেএসএসের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর রাঙামাটি থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী এবং চট্টগ্রাম-৫ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়। পরে দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন এবং ২১ আগস্ট ২০২৬ বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাংচিং প্রু জেরীকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়নসহ সরকারি কার্যক্রমের তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের ওপর দেওয়া হয়েছে।বিবৃতির শেষাংশে সরকারের কাছে চারটি দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
দাবিগুলো হলো—
১.পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয়, নির্বাহী ও পরামর্শক—এই তিন কমিটি অবিলম্বে বাতিল করা।
২.পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি পুনর্গঠন করে চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া।
৩.পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ গ্রহণ করা।
৪.প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদ সংরক্ষণ না করা।
পিসিজেএসএসের বিবৃতির মূল বক্তব্য হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সংগঠনটি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়নকে এ ক্ষেত্রে প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
তবে সরকারের গঠিত তিন কমিটি সম্পর্কে পিসিজেএসএসের এসব আপত্তি ও মূল্যায়ন সংগঠনটির নিজস্ব বিবৃতি ও অবস্থান হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বিবৃতিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া বা ব্যাখ্যা এই নথিতে উল্লেখ নেই।