বান্দরবানের লামা প্রেসক্লাবের সদস্যপদ, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে নতুন করে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
গতকাল ১৮ সেপ্টেম্বর প্রেসক্লাবের সাবেক নেতৃত্বের সভাপতিত্বে প্রেসক্লাব কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।অন্যদিকে নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য’র ব্যানারে ‘ফ্যাসিস্ট মুক্ত লামা প্রেসক্লাব গঠনের দাবিতে’ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
পরে নানা নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে নির্বাচন সম্পূর্ণ হয় এবং মো. কামরুজ্জামানকে সভাপতি এবং মো. নুরুল করিম আরমানকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। এবং কমিটির পক্ষ থেকে এটিকে লামা প্রেসক্লাবের ত্রিবার্ষিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত কমিটি হিসেবে দাবি করা।
অন্যদিকে লামা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে ফ্যাসিস্ট মুক্ত লামা প্রেসক্লাব গঠনের দাবিতে করা মানববন্ধনে বক্তারা লামা প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রক্রিয়া, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলেন। তারা প্রেসক্লাবকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান।
মানববন্ধনের পর একইদিন বিকেলে আরেক পক্ষ মোহাম্মদ করিম এলএল.বি.-কে সভাপতি এবং আমিনুল ইসলাম খন্দকারকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি ঘোষণা করে বলে জানা গেছে।
ফলে বর্তমানে লামা প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব নিয়ে দুটি পৃথক কমিটি ও পাল্টাপাল্টি দাবির বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক বৈধতা, সদস্য তালিকা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে প্রেসক্লাবের সদস্যপদ নবায়ন ও নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া সীমিত রয়েছে। তাদের দাবি, নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের সদস্য হওয়ার সুযোগ তৈরি না হওয়ায় পেশাগত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ করিম বলেন, “লামা প্রেসক্লাব যেখানে সকল সাংবাদিকদের মুক্তমঞ্চ হওয়ার কথা, সেখানে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে এটি আজ যেন একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।”
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, “একটি প্রাচীন প্রেসক্লাব নতুন মুখ গ্রহণ না করায় আমরা তরুণরা চরম হতাশার মধ্যে আছি। নতুন কাউকে সহ্য করতে পারে না লামা প্রেসক্লাবের সদস্যরা। আমাদের বলে অন্য আরও সংগঠন আছে, সেখানে গিয়ে জায়গা নিতে।”
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন লামা প্রেসক্লাবের সাবেক সেক্রেটারি মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, “দেড় যুগেও আমরা কোনো যোগ্য সংবাদকর্মী লামায় খুঁজে পাইনি। তাই কাউকে প্রেসক্লাবের সদস্য করা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রেসক্লাবের দায়িত্বশীল সদস্যরা গোপনে বা প্রকাশ্যে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীদের বিশেষ নজরদারিতে রাখার পর সদস্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সদস্য হতে ইচ্ছুক অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীকে প্রাথমিকভাবে সহযোগী সদস্যপদ প্রদানের সুপারিশ করা হয়।”
লামা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রিয়দর্শী বড়ুয়া বলেন, “আমি সবসময় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে। তবে লামা প্রেসক্লাবের অধিকাংশ সদস্য নতুন কাউকে স্থান করে দেওয়ার পক্ষে নয়। তাই নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি দেড় দশকেও। এটি আমাদের ব্যর্থতা।”
এদিকে, দুটি কমিটি সামনে আসার পর স্থানীয় সাংবাদিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—কোন কমিটি প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী বৈধভাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং দীর্ঘদিনের সদস্যপদ ও নেতৃত্বসংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিরোধ নিরসনে প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র, বৈধ সদস্য তালিকা, পূর্ববর্তী কমিটির মেয়াদ এবং নির্বাচন বা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে লামা প্রেসক্লাবকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর সাংবাদিক সংগঠন হিসেবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে।