পাহাড়ের দুর্গম জনপদে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেখানে অনেক মানুষের জন্য এখনও বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে একটি মানবিক উদ্যোগ। বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের মাধ্যমে চোখের আলো ফিরিয়ে দেওয়ার ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বান্দরবানে অনুষ্ঠিত হয়েছে চক্ষু অপারেশন-পরবর্তী ফলোআপ ক্যাম্প।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বান্দরবান সদর এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং-এর কার্যালয়ে এ ফলোআপ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। ক্যাম্পে বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকরা সরাসরি উপস্থিত থেকে ৩য় ও ৪র্থ দফায় ছানি অপারেশন করা রোগীদের চোখ পরীক্ষা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া হয় চিকিৎসা পরামর্শ ও ওষুধ।
শুধু চিকিৎসা প্রদান নয়, অপারেশনের পর রোগীদের চোখের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তারা নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন কি না—সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এ কার্যক্রমে। ফলে অনেক দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশার আলো।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং-এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কারিগরি সহযোগিতায় এ চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক উছোমং মার্মা জানান, ৩য় ও ৪র্থ দফায় বিনামূল্যে ছানি অপারেশন করা ২০০ জন রোগীকে ফলোআপ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে ৭০ জন রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরবর্তী সময়ে চক্ষু অপারেশনের জন্য বাছাই করা হয়েছে।তিনি বলেন, “অনেক রোগীর কাছে চোখের চিকিৎসা করানো শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ।
চলমান এই কার্যক্রমে কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে পিছিয়ে না পড়েন এবং সবাই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সে জন্য আমাদের টিম সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছে।”
তিনি আরও বলেন, “আর্থিক বা সামাজিক লাভের প্রত্যাশা না করে মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় সময় ও শ্রম দেওয়ার মাধ্যমেই আমাদের এই কার্যক্রম চলছে। একজন মানুষের চোখের আলো ফিরে পাওয়া এবং তার পরিবারের মুখে স্বস্তির হাসি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”পাহাড়ি অঞ্চলের দরিদ্র ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য এমন উদ্যোগের গুরুত্বও অনেক। অর্থের অভাবে কিংবা দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে যেসব মানুষ দীর্ঘদিন চোখের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও অপারেশনের এই সুযোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার পর অনেক রোগী আবার পরিবারের কাজে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনেও ফিরতে পারছেন।
ফলোআপ ক্যাম্পে আরও উপস্থিত ছিলেন নুঙেচিং মার্মা, উচসিং মার্মা, প্রকৃতি বড়ুয়া, সাংবাদিক বাবুল খাঁনসহ সংশ্লিষ্টরা।উল্লেখ্য, পাহাড়ের মানুষের চোখের আলো টিকিয়ে রাখতে ২০২৫ সাল থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং। এর আগে বান্দরবানের দুর্গম রোয়াংছড়ি ও রুমা উপজেলায় সফলভাবে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
তারই ধারাবাহিকতায় এবার বান্দরবান জেলা সদরের মানুষের জন্য এ সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
একজন মানুষের চোখের আলো ফিরে পাওয়া মানে শুধু তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া নয়—ফিরে পাওয়া তার আত্মনির্ভরতা, কর্মক্ষমতা এবং পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনের আনন্দ। পাহাড়ের মানুষের সেই আলো জ্বালিয়ে রাখার মানবিক প্রয়াসই এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগের মাধ্যমে।