সভা ছাড়াই একক সিদ্ধান্ত, টেন্ডার ছাড়াই অগ্রিম অর্থ ছাড়ের অভিযোগ

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের বিশেষ বরাদ্দের ক্রীড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, কমিটির সদস্যদের অংশগ্রহণ ছাড়া একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অগ্রিম অর্থ ছাড়ের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্থানীয় খেলোয়াড়দের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া তিন বছর মেয়াদি ক্রীড়া কর্মসূচির আওতায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। তবে দীর্ঘ সময় পরও প্রকল্পটির পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি, অর্থ ব্যয় এবং কমিটির কার্যক্রম নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক পরিষদের তৎকালীন সদস্য অ্যাডভোকেট উবাথোয়াই মারমা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন বছর মেয়াদি ওই ক্রীড়া কর্মসূচির সম্পূর্ণ অর্থ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র একদিন আগে দ্রুততার সঙ্গে অগ্রিম চেকের মাধ্যমে ছাড় করা হয়। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কমিটির আহ্বায়কের একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি কর্মসূচি কেন স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলো—তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

কমিটির সদস্যদের পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্তের অভিযোগ

প্রকল্পের আওতায় খেলোয়াড় বাছাই, প্রশিক্ষণের স্থান, সময়সূচি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কমিটির অন্য সদস্যদের যথাযথ অংশগ্রহণ ছাড়াই নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া জেলা পরিষদের সঙ্গে ন্যস্ত বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী, জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা ছাড়া জেলার ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে দাবি ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের। শুরুতে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তাকে কমিটির সদস্য সচিব করা হলেও পরবর্তীতে তার অংশগ্রহণ ছাড়াই নতুন করে কমিটি গঠন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় কনভেনিং কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট উবাথোয়াই মার্মার বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় লামা উপজেলায় ফুটবল প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ থাকলেও স্থানীয় অনেক খেলোয়াড়ই এমন কোনো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের অর্থ ছাড় এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান সদর ও থানচি উপজেলায় নারী-পুরুষ উভয় খেলোয়াড়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলেও অন্যান্য উপজেলায় শুধু পুরুষ খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানী ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ উপজেলায় প্রশিক্ষণার্থীদের দৈনিক ৩৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হলেও রোয়াংছড়ি উপজেলায় অংশগ্রহণকারীদের ২৫০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অভিযোগ ওঠার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে কয়েকটি উপজেলায় তড়িঘড়ি করে ফুটবল প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সমালোচনা এড়াতে পরবর্তীতে সীমিত আকারে কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি, অর্থ ব্যয়, কমিটির কার্যকর অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠা মৌলিক প্রশ্নগুলোর এখনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৯ জুন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাইয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদের অষ্টম মাসিক সভায় জেলার ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রাথমিকভাবে অ্যাডভোকেট উবাথোয়াই মার্মাকে আহ্বায়ক এবং জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয় জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক জাবেদ রেজা, ফুটবল খেলোয়াড় সমিতির সভাপতি মো. ইসলাম কোম্পানী, জেলা ক্রিকেট আম্পায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের টিপু, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের রফিকুল আলম মামুন এবং তৎকালীন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য থুইসিং প্রু লুবুকে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিষদের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত এই কর্মসূচিতে গঠিত কমিটির অধিকাংশ সদস্যের কার্যকর কোনো অংশগ্রহণ ছিল না।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ক্রীড়া বিষয়ক কনভেনিং কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট উবাথোয়াই মার্মার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালে তিনি ব্যস্ত আছেন পরে কথা বলবেন বলে জানান। ফলে এ বিষয়ে তার বর্তমান বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

তবে অভিযোগ ওঠার সময় গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছিলেন, তড়িঘড়ি করে কিছু করা হয়নি; অর্থবছর শুরুর আগ থেকেই প্রক্রিয়া চলমান ছিল এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের তত্ত্বাবধানে সদস্যদের সমন্বয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল।

বরাদ্দের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তখন তিনি বলেছিলেন, চূড়ান্ত বাজেট অনুমোদন না হওয়ায় সে মুহূর্তে নির্দিষ্ট অঙ্ক জানানো সম্ভব নয়।

জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফএ) বা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্পৃক্ততা না থাকার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, এসব সংগঠন জেলা পরিষদের অধীন নয়। তাই তাদের সম্পৃক্ততার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রয়োজন হলে সহযোগিতা নেওয়া হবে।