বান্দরবানের লামা উপজেলায় বন বিভাগের কর্মকর্তা ও গাছ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো. উসমান গণি নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত মো. উসমান গণি বান্দরবানের লামা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড নয়াপাড়া এলাকার নুর মোহাম্মদের ছেলে।
লামা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মো. উসমান গণি একজন চিহ্নিত বনদস্যু। তিনি আলীকদম উপজেলার তৈন রেঞ্জের কাঁকড়া ঝিরি এলাকায় ২০২৫ সালের ২৯ জুন সংরক্ষিত বনের সেগুন গাছ কেটে পাচারের সময় বন বিভাগের টহল দলের হাতে ধরা পড়েন। সরকারি বনভূমিতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে সেগুন গাছ কর্তন ও চুরির অপচেষ্টা চালানোর অপরাধে ওই দিনই তার বিরুদ্ধে ‘বন মামলা নং ৪৯/তৈন অব ২০২৪-২৫’ দায়ের করা হয়। ওই মামলায় উসমান গণি দীর্ঘদিন কারাবাসও করেন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. উসমান গণি বাদী হয়ে গত ১৬ জুলাই বান্দরবানের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৩ এ লামা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন, গাছ ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বাবলু ও রিকশাচালক রশিদ আহমদের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। যার সি.আর. মামলা নম্বর: আলীকদম ৫৯/২০২৬।
এর আগে, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর উসমান গণি বাদী হয়ে লামার বিশিষ্ট গাছ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বেচু, আব্দুল জলিল, দেলোয়ারসহ অজ্ঞাতনামা আরও তিন-চার জনের বিরুদ্ধে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট লামা চৌকি আদালতে আরও একটি মামলা দায়ের করেন। যার সি.আর. মামলা নম্বর: ৩৫০/২০২৫। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) মো. সালাহ উদ্দিন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার ঘটনার সত্যতা প্রমাণের সপক্ষে সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অজ্ঞাতনামা বিবাদীদের নাম-ঠিকানা সর্বাত্মক চেষ্টা করেও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাই তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রার্থনা করা হয়। ফলশ্রুতিতে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়।
এছাড়া, উসমান গণি ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলামসহ গাছ ব্যবসায়ী ও দুই শ্রমিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে থানায় জিডি করেন। যা পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে নন-জিআর মামলায় রূপ নেয়।
ভুক্তভোগী ও মামলার ২ নম্বর বিবাদী রেজাউল করিম বাবলু অভিযোগ করে বলেন, "এই নিয়ে উসমান গণি আমার কাছ থেকে তিন দফায় মোট ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। টাকা নেওয়ার সময় তিনি দুইবার লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন এবং একবার মৌখিক অঙ্গীকার করেছেন। লিখিত অঙ্গীকারনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন—আমার সাথে তাঁর কোনো দাবিদাওয়া, ক্ষোভ ও বিরোধ নেই। ভবিষ্যতে থানা বা আদালতে তিনি কোনো ধরনের মামলা-মোকদ্দমা করবেন না এবং আমাদের মধ্যে যাতে কোনো বিরোধ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন।"
গাছ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বেচু জানান, "উসমান গণি একজন বনদস্যু। সে সবসময় গাছ চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। এ বিষয়গুলো আমরা সবাই জানি। তাকে অনেকবার এই অপরাধমূলক কাজ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু এতে সে ক্ষিপ্ত হয়ে আমারসহ অসংখ্য ব্যবসায়ীর হয়রানির উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। আমরা তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ।"
লামা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন বলেন, “আমি লামায় কর্মস্থলে যোগদান করেছি ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর। অথচ ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর উসমান আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, আমি নাকি ওই দিন তাকে লামা বাজার থেকে তুলে এনে মারধর করেছি—এমন একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে সে। এটা কীভাবে সম্ভব? আমি লামায় যোগদানের মাত্র দুই দিন পরেই কীভাবে তাকে মারধর করব? আমি তো তাকে চিনতামই না। একটি নতুন জায়গায় যোগদানের পর সেখানকার পরিবেশ ও লোকজনকে চিনতেই তো কয়েকমাস সময় লেগে যায়। সেখানে মাত্র একদিনের মধ্যে আমি কীভাবে উসমানকে চিনব? মূলত আমাকে হয়রানি করার জন্য দুষ্কৃতকারীদের কুবুদ্ধিতে সে এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করেছে।
লামা বন বিভাগের তৈন রেঞ্জের কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম জানান, উসমান গণির বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা হওয়ার পর থেকে সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এরপর থেকে তিনিসহ বন বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা ও কাল্পনিক অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করে আসছে সে। এই কাজে তাকে উসকে দিচ্ছে চিহ্নিত একটি বনদস্যু চক্র।
মামলা দিয়ে হয়রানি করা ও টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. উসমান গণি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে বন বিভাগ মামলা দিয়েছে, তাই আমিও মামলা করেছি—তাতে কী হয়েছে? আমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নিইনি।’
আরো পড়ুন→রোয়াংছড়িতে ১৮ হাজার চারা বিতরণ করেছে জেলা কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি