সরকার গঠনের ৫ মাস অতিবাহিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতারা। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সকল অংশীজনকে সম্পৃক্ত করার জন্য অবিলম্বে একটি ‘জাতীয় কমিশন’ গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আজ বুধবার ঢাকা প্রেস ক্লাবে ‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’-এর উদ্যোগে ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ৫ মাস: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের অন্যতম সদস্য দীপায়ন খীসার সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, এএলআরডি-র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফি রতন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ফজলুল রশিদ ফিরোজ।
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, "পার্বত্য চট্টগ্রামে কার্যত এক ধরনের অঘোষিত সামরিক শাসন ও অতিমাত্রায় সামরিকীকরণ বিদ্যমান, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে। বিএনপি সরকার তাদের ৩১ দফায় ‘রেইনবো নেশন’ গঠনের কথা বললেও সরকার গঠনের ৫ মাসে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ দেখেনি। দ্রুত পার্বত্য বিষয়ে অংশীজনদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা জরুরি।"
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ১৭ বছর ক্ষমতায় থেকেও চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন করেনি। পার্বত্য সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা সেনাবাহিনীর থাকলেও মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।" তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থির রেখে টেকসই শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
এএলআরডি-র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা উল্লেখ করেন, "পার্বত্য চুক্তি এরশাদ সরকার, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—সব দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছিল। এটি কোনো একক দলের কৃতিত্ব নয়। বর্তমান বিএনপি সরকারের উচিত এই চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত এগিয়ে আসা।"
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান ও বাসদের ফজলুল রশিদ ফিরোজ চুক্তির মৌলিক ধারা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁরা বলেন, ২৪ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামের পর স্বাক্ষরিত এই চুক্তির প্রায় তিন দশক হতে চললেও বাস্তবায়ন না হওয়া রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। বৈষম্য ও পরিচয়ভিত্তিক অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি না করে পাহাড়ের বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান তাঁরা।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফি রতন বলেন, পাকিস্তান আমল থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ উপেক্ষিত। ভূমিসংকট নিরসন ও সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজা উচিত।
সভায় মূল লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, গত ৩ মার্চ সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়ে পাহাড়িদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট আহ্বান জানানো সত্ত্বেও গত ৫ মাসে কোনো অগ্রগতির মুখ দেখা যায়নি। উপরন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্ত চুক্তি পরিপন্থী।
পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আয়োজকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ৬ দফা দাবি পেশ করা হয়:
- অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে একজন পাহাড়ি প্রতিনিধিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া এবং বর্তমান অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার করা।
- চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করা।
- চুক্তি বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা।
- দ্রুততম সময়ে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি’ পুনর্গঠন করা।
- বিধিমালা প্রণয়নসহ ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ অবিলম্বে সক্রিয় করা।
- অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক সংলাপ আয়োজন করা।