মায়া-নদের প্রহরী

​দিগন্তজোড়া ঘন কুয়াশা ভেদ করে অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে এক রহস্যময় নদ। লোকে একে নীলনদ বলে ডাকলেও, এর রূপ আর পাঁচটা নদীর মতো নয়। এর জল কুচকুচে কালো, অথচ তার বুক চিরে ঠিকরে বেরোচ্ছে এক অপার্থিব নীল আভা—যেন কোনো তরল নীলকান্তমণি গলে গলে বয়ে যাচ্ছে। নদীর এপারে একাকী দাঁড়িয়ে ছিল এক যুবক, নাম তার আরণ্যক। তার অবিন্যস্ত চুল আর চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি বলে দিচ্ছিল, এক দীর্ঘ ও শ্রান্তিকর পথ পেরিয়ে সে এখানে এসে পৌঁছেছে। তবে সেই ক্লান্ত চোখেই জ্বলজ্বল করছিল ওপারে যাওয়ার এক তীব্র, প্রায় উন্মাদ ফিসফিসানি।

​নদীর ওপারে কুয়াশার পর্দা ভেদ করে আবছা দেখা যাচ্ছে এক স্বর্ণালী শহরের চূড়া। জনশ্রুতি আছে, ওখানে পৌঁছাতে পারলে জীবনের সব হারিয়ে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর মেলে, পাওয়া যায় পরম শান্তি। কিন্তু ওপারে যাওয়ার পথটা বড় নির্মম। প্রবাদ আছে, এই মায়াবী নদীর জল স্পর্শ করলেই মানুষ তার সমস্ত অতীত স্মৃতি, তার ভালোবাসা, তার বেদনা—এককথায় তার নিজের অস্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলে। ওপারে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আর এপারে নিজের চেনা 'আমি'-কে চিরতরে হারিয়ে ফেলার ভয়—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় জমে দাঁড়িয়ে ছিল আরণ্যক। তার পায়ে কোনো দৃশ্যমান শিকল ছিল না, তবুও এক অদৃশ্য ভারী শৃঙ্খল তাকে একচুলও নড়তে দিচ্ছিল না।ঠিক তখনই আরণ্যক টের পেল, কুয়াশার বুক চিরে কিছুটা দূরে এসে দাঁড়িয়েছে এক রহস্যময় ছায়ামূর্তি।

​অচেনা ছায়া

আগন্তুকের পরনে একটি ধূসর আলখাল্লা, যার শেষপ্রান্ত মাটির কুয়াশায় মিশে গেছে। তার মুখাবয়ব অন্ধকারের এক গভীর চাদরে ঢাকা, চেনা যায় না কোনো অবয়ব। সে আরণ্যকের দিকে এগিয়ে এলো না, কোনো চেনা অভিবাদনও জানাল না। শুধু দূর থেকে একদৃষ্টিতে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। সেই নীরবতার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, আরণ্যকের মনে হলো—এই আগন্তুক বুঝি বাইরের কেউ নয়, বরং তার নিজেরই ভেতরের এক দ্বিধাগ্রস্ত, স্তব্ধ সত্তা, যা শরীরী রূপ নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

​"তুমি কি ওপারে যেতে চাও?"

​হঠাৎ চারপাশের আদিম নিস্তব্ধতা ভেঙে একটি গম্ভীর অথচ সুরময় কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। বাতাস যেন সেই স্বরে কেঁপে উঠল। আরণ্যক চমকে উঠে আগন্তুকের দিকে তাকাল। আগন্তুকটি এক পা এগিয়ে এলো, কিন্তু তার মুখের অন্ধকার বিন্দুমাত্র কমল না।

​আরণ্যক বুকের গভীরে জমে থাকা বাতাসটুকু ছেড়ে দিয়ে বলল, "হ্যাঁ, চাই। কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি। ওপারে যাওয়ার মূল্য যদি হয় আমার নিজেকেই ভুলে যাওয়া, আমার চেনা অতীতকে বিসর্জন দেওয়া—তবে সেই পরম প্রাপ্তির কী অর্থ রইল? নিজেকে হারিয়ে পাওয়া শান্তি তো আসলে এক ধরণের মৃত্যু।"

ওপারে এবং এপারের রহস্য

আগন্তুকটি এবার ধীর পায়ে নদীর একদম কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল। নদীর নিঝুম নীল আলো তখন তার ধূসর আলখাল্লার ওপর এসে মায়াবী এক নকশা তৈরি করেছে। সে নদীর বয়ে চলার দিকে ইশারা করে বলল:

"এই নদীটি কোনো বাধা নয়, আরণ্যক। এটি আসলে একটি আয়না। যারা ওপারে যাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা বুকে নিয়ে এখানে আসে, তারা আসলে নদীর ওপারের ওই স্বর্ণালী শহরকে খোঁজে না; তারা পালায় নিজের ভেতরের শূন্যতা, ব্যর্থতা আর ক্ষতবিক্ষত অতীত থেকে। তারা মনে করে ভুলে যাওয়াটাই মুক্তি। আর আমি? আমি হলাম এই মায়া-নদের প্রহরী। যখনই কোনো পথিক এখানে এসে নিজের অস্তিত্ব আর পলায়নবৃত্তির মাঝে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আমি তার সেই দ্বিধাকে পাহারা দিই। তাকে সময় দিই নিজের মুখোমুখি হওয়ার।"

প্রহরীর এই একটি কথাই যেন আরণ্যকের মনের ভেতরের সব অন্ধকার দূর করে দিল। এক তীব্র আত্মোপলব্ধি আছড়ে পড়ল তার মগজে। সে বুঝতে পারল, ওপারে আসলে কোনো জাদুকরী শহর নেই। নদীর ওপারে যাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা আসলে জীবনের কঠিন পরিস্থিতি, লড়াই আর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে না পেরে পালিয়ে যাওয়ার একটি প্রতীকী রূপ মাত্র। আর এই আগন্তুক তাকে পথ দেখানোর কোনো দেবতা বা জাদুকর নয়, বরং তার নিজেরই সুপ্ত বিবেক, যা তাকে ভুল পথে পা বাড়ানোর আগে থমকে দাঁড়াতে এবং ভাবতে বাধ্য করেছে।

​এক নতুন সকাল

​হঠাৎ করেই চারপাশের পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। মায়া-নদের ওপর জমে থাকা আদিম কুয়াশাগুলো ভোরের প্রথম আলোর স্পর্শে ধীরে ধীরে কর্পূরের মতো উড়ে যেতে লাগল। ভোরের সেই কাঁচা রোদ যখন কালো জলের ওপর পড়ল, তখন নদীর সেই অপার্থিব নীল আলোটাও যেন মিলিয়ে গেল এক শান্ত স্বাভাবিকতায়।

​আরণ্যক এক দীর্ঘশ্বাস নিল, তবে এবার সেই শ্বাসে কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল মুক্তির আনন্দ। সে বুঝতে পারল, নদীর ওপারে গিয়ে সব ভুলে গিয়ে কাপুরুষের মতো শান্তি খোঁজার মাঝে কোনো বীরত্ব নেই; বরং এপারে চেনা পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে, নিজের স্মৃতি আর ক্ষতগুলোকে সঙ্গী করে জীবনের যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়াই আসল সার্থকতা। লড়াইটাই তো জীবন!

​সে যখন পরম কৃতজ্ঞতায় ঘুরে দাঁড়িয়ে আগন্তুককে ধন্যবাদ জানাতে গেল, দেখল সেখানে কেউ নেই। ধূসর আলখাল্লা পরা সেই প্রহরী কুয়াশার সাথেই মিলিয়ে গেছে। শুধু সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই মাটির ওপর পড়ে আছে একটি উজ্জ্বল নীল রঙের পালক—যেন এক নতুন আশার প্রতীক।

​আরণ্যক আলতো করে পালকটি কুড়িয়ে নিল এবং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে নদীর দিক থেকে চিরতরে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে আবার তার নিজের চেনা, ধূলিমলিন কিন্তু সত্য পথের দিকে হাঁটতে শুরু করল। এবার তার পায়ে আর কোনো জড়তা ছিল না, বুকে ছিল না কোনো সংশয়; বরং প্রতিটা পদক্ষেপে মিশে ছিল এক নতুন, অদম্য আত্মবিশ্বাস।

একটি  ছোট গল্প