
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা অঞ্চলে আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়ের তীব্র ভূমি সংকট, ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ বিহারের জমি বেদখল এবং উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসন প্রক্রিয়া থমকে থাকার বাস্তব চিত্র পরিদর্শনে এসেছে 'সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস্' নামের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
প্রতিনিধি দলে ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, রান-এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম, গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা এবং ল্যান্ড ইজ লাইফ-এর এশিয়া প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সতেজ চাকমা।
গত ১২ জুন প্রতিনিধি দলটি কুয়াকাটার ঐতিহ্যবাহী শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন করে স্থানীয় আদিবাসী নেতা ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে মতবিনিময়ে বসে।
এসময় বিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু জানান, ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ আমলে ২ একর ৪৪ শতাংশ জমির ওপর বিহারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬২ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণের সময় বিহারের বড় অংশ চলে যায়। বর্তমানে বিহারের দখলে আছে মাত্র ৬৫ শতাংশ জমি। অবশিষ্ট জমিও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অধিগ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
জানাযায়, “এটি পটুয়াখালী জেলার একমাত্র 'সীমা বিহার', যেখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জীবনাচরণ ও উপসম্পাদা গ্রহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'সীমাঘর' অবস্থিত। জমি হাতছাড়া হলে এই ধর্মীয় ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।
মিশ্রিপাড়ার প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারটির ২ একরের বেশি জমি স্থানীয় প্রভাবশালী বাঙালিরা দখলের চেষ্টা করছে বলে জানান বিহারের অধ্যক্ষ উত্তমা মহাথেরো।
রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মং হ্লা সেইন রাখাইন জানান, “রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু অসৎ কর্মচারীর সহায়তায় জাল দলিলের মাধ্যমে রাখাইনদের জমি দখল করা হচ্ছে। আদিবাসীরা যেখানে ২ একর জমি বিক্রি করে, সেখানে কৌশলে ৫ একর লিখে নেওয়া হয়। আদালতের রায় থাকার পরও আমরা জমি উদ্ধার করতে পারছি না।"
আরো জানাযায়, “নয়াপাড়া গ্রামে রাখাইনদের শ্মশানভূমির জায়গা বেদখল করে গাছ লাগিয়েছে বাবুল আখতার নামের একটি বাঙালি পরিবার। বাবুল আখতার দাবি করেন, ৪০-৫০ বছর আগে তাঁর দাদা এই জমি রাখাইনদের কাছ থেকে কিনেছিলেন, তবে শ্মশানের অংশটি তাঁদের কেনা জমির ভেতরে কি না তা তিনি নিশ্চিত নন। প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে উভয় পক্ষ দ্রুত জমি মেপে সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২১ সালে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের কারণে ছ-আনি পাড়া থেকে উচ্ছেদ হওয়া ৬টি রাখাইন পরিবার গত ৫ বছর ধরে চরম পুনর্বাসন সংকটে ভুগছে। উচ্ছেদের সময় প্রশাসন থেকে স্থায়ী পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত মাসিক ৫,০০০ টাকা বাড়ি ভাড়া দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৬ মাস পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের এক চিঠিতে কলাপাড়ার সোনাপাড়া মৌজায় ৪০ শতাংশ জমি কেনার কথা জানানো হলেও, সরেজমিনে দেখা গেছে কেবল ডিমারকেশন (সীমানা নির্ধারণ) করা হয়েছে। মাটি ভরাট বা ঘর তৈরির কাজ এখনো বাকি। চলতি জুন (২০২৬) মাসেই এই পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চলায় পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল এবং বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মং চৌথিন তালুকদার কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে ৫টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন:
১. কলাপাড়ায় রাখাইন সম্প্রদায়ের জন্য স্থায়ী শ্মশানের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া।
২. বন্ধ থাকা রাখাইন কালচারাল একাডেমি দ্রুত সংস্কার ও চালু করে রাখাইন মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া।
৩. রাখাইনদের বেদখল হওয়া ভূমি ও শ্মশান পুনরুদ্ধার করা এবং হয়রানিমূলক মামলা নিষ্পত্তি করা।
৪. রাখাইন তাঁত শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করা।
৫. পায়রা বন্দরের কারণে উদ্বাস্তু হওয়া ছ-আনি পাড়ার ৬টি পরিবারকে দ্রুত আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে ঘর তৈরি ও ভূমির মালিকানা হস্তান্তর করা।
দাবিগুলোর সাথে একমত পোষণ করে কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিক বলেন, "রাখাইনদের ভূমি রক্ষায় প্রশাসন আন্তরিক। প্রভাবশালীরা জাল দলিলের মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা করে থাকে।" তিনি দ্রুত কালচারাল একাডেমি চালু, তাঁত শিল্পে সহায়তা এবং পর্যটকদের জন্য একটি রাখাইন রেস্তোরাঁ চালুর ব্যাপারে আশ্বাস দেন।
আজ ১৪ জুন প্রতিনিধি দলটি উচ্ছেদকৃত রাখাইনদের পুনর্বাসনের বিষয়ে গতি আনতে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথেও জরুরি বৈঠক করেছে।
উপদেষ্টাঃ কে এস মং
প্রকাশক: মাহাবুব হাসান খাঁন বাবুল
সম্পাদকঃ এস এম নাসিম
বার্তা সম্পাদকঃ খালেদ মাহাবুব খাঁন আরাফাত
যোগাযোগঃ বান্দরবান সদর, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
ইমেইলঃ newspaharkantho@gmail.com
মোবাইলঃ ০১৮২৬১৬১০৯৮,০১৭৪৯৬৪৮৬৮৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৭-২০২৬