
বিশেষ প্রতিবেদনঃ দেশের সমতলের জেলাগুলোর পাশাপাশি পাহাড়ি অঞ্চলেও সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। নারী ও শিশু অধিকারকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফের পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়; বরং এটিএ আমাদের সামাজিক, আইনি এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থার এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের ফল। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের অপব্যবহার—সবকিছুই এই অপরাধকে উস্কে দিচ্ছে।
অনুসন্ধান ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করে পাহাড় থেকে সমতলে ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে মূলত ৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
অধিকাংশ অপরাধবিজ্ঞানী মনে করেন, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বেশি সাহসী করে তুলছে। দেশে একটি ধর্ষণ মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে প্রভাবশালী আসামিরা জামিনে বের হয়ে আসে কিংবা প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ ধর্ষণ মামলায় চূড়ান্ত রায়ে আসামির সাজা হওয়ার হার অত্যন্ত কম, যা অপরাধীদের মনে আইনভীতির বদলে এক ধরনের ঔদ্ধত্য তৈরি করছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্ষণ কেবল একটি শারীরিক বা যৌন অপরাধ নয়, এটি মূলত ক্ষমতার দাপট ও আধিপত্য প্রকাশের একটি বিকৃত মাধ্যম। সমাজে নারী ও শিশুদের দুর্বল বা অধীনস্থ ভাবার প্রাচীন মানসিকতা এখনো প্রবল। এর সাথে যখন স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ার জোর যোগ হয়, তখন অপরাধীরা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে। বিশেষ করে পাহাড়ি বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তার অভাবকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
আমাদের সমাজে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুকে যেভাবে দেখা হয়, তা পরোক্ষভাবে অপরাধীদেরই আড়াল করে। লোকলজ্জা, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া এবং একঘরে হওয়ার ভয়ে অনেক পরিবার মামলাই করতে চায় না। এর ওপর যোগ হয় 'ভিকটিম ব্লেমিং' বা আক্রান্ত ব্যক্তিকে দোষারোপের সংস্কৃতি। অপরাধীর কঠোর শাস্তির দাবি তোলার বদলে অনেক সময় ভিকটিমের পোশাক, চলাফেরা বা বাইরে বের হওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, যা মূল অপরাধের ভয়াবহতাকে আড়াল করে দেয়।
পারিবারিক শিক্ষার অভাব এবং নৈতিক মূল্যবোধের পতনকে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান যুগে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অবাধ ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলে বিকৃত যৌন কনটেন্ট ও পর্নোগ্রাফির বিস্তার ঘটেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এটি তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশের মনস্তত্ত্বে নারীর প্রতি সহিংস ও বিকৃত মানসিকতা তৈরি করছে। এর পাশাপাশি সমাজে মাদকের বিস্তার অপরাধপ্রবণতা এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতা বাড়াতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
আইনজীবীদের মতে, আমাদের প্রচলিত দণ্ডবিধির (Penal Code) ধর্ষণের সংজ্ঞাটি অনেক পুরনো। আধুনিক যুগে যৌন সহিংসতার যে বহুমাত্রিক রূপ বা ডিজিটাল মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করে যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর অনেক কিছুই এই প্রাচীন সংজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়। ফলে আইনি মারপ্যাঁচে এবং প্রমাণের অভাবে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল কঠোর আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। অপরাধের দ্রুততম সময়ে বিচার (Fast-track trial) নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একই সাথে পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব পর্যায়ে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সম্মতির (Consent) গুরুত্ব শিক্ষা দেওয়া এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আরো পড়ুন→নাইক্ষ্যংছড়িতে ভূমি সেবা মেলার সমাপনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন
উপদেষ্টাঃ কে এস মং
প্রকাশক: মাহাবুব হাসান খাঁন বাবুল
সম্পাদকঃ এস এম নাসিম
বার্তা সম্পাদকঃ খালেদ মাহাবুব খাঁন আরাফাত
যোগাযোগঃ বান্দরবান সদর, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
ইমেইলঃ newspaharkantho@gmail.com
মোবাইলঃ ০১৮২৬১৬১০৯৮,০১৭৪৯৬৪৮৬৮৬
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০১৯-২০২৬